রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে হাতে নেওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড বা ডিএমটিসিএল এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি-৫ উত্তর লাইন প্রকল্পের ব্যয় ১ লাখ ২১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। প্রকল্প দুটির প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় এই অঙ্ক দ্বিগুণেরও বেশি। পরিকল্পনা কমিশনের কাছে অনুমোদনের জন্য এই প্রস্তাব পাঠানোর পর তা এখন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
বাস্তবায়নকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু ব্যয় নয়, সেই সঙ্গে প্রকল্প দুটির নির্মাণকালও পাঁচ থেকে ছয় বছর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। রাজধানীর উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব প্রান্তের সঙ্গে যাতায়াত সহজ করতে নেওয়া এই বৃহৎ প্রকল্পগুলো বর্তমানে প্রাথমিক নির্মাণ পর্যায়ে রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ এই অতিরিক্ত ব্যয়ের নেপথ্যের কারণগুলো খতিয়ে দেখছে। এর আগে চলতি বছরের মে মাসে সরকারের পক্ষ থেকে একটি সাত সদস্যের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়ার নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটি চলতি মাসের শুরুর দিকে সরকারের কাছে তাদের সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার অবমূল্যায়ন, সার্বিক মূল্যস্ফীতি এবং নির্মাণ সামগ্রীর আমদানির ওপর নতুন কর আরোপের কারণে ব্যয় এই পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান শামীম জেড বসুনিয়া জানান, আজ থেকে পাঁচ কিংবা সাত বছর আগে যখন মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি তৈরি করা হয়েছিল, তার তুলনায় বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সব ধরনের উপকরণের দাম বহুগুণ বেড়ে গেছে। ভারতের মতো দেশে লোহা, সিমেন্ট ও পাথরের মতো নির্মাণসামগ্রী দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গেলেও বাংলাদেশে প্রায় সব উপকরণই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই বাস্তবতার কারণে প্রতিবেশী দেশের নির্মাণ ব্যয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের খরচের তুলনা করা পুরোপুরি অমূলক।
দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প হিসেবে পরিচিত এমআরটি লাইন-১ এর ব্যয় প্রায় ১২৯ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে ডিএমটিসিএল। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত দুটি রুটে বিস্তৃত এই প্রকল্পের নতুন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে একনেক সভায় অনুমোদিত মূল ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত এই ব্যয় মঞ্জুর হলে এটি হবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রকল্প। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর রুটটি সম্পূর্ণ পাতাল এবং পূর্বাচল রুটটি প্রধানত উড়াল সেতু হিসেবে নির্মিত হচ্ছে। দুই রুট মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় আট লাখ যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকা এই প্রকল্পে বড় অংকের ঋণ সহায়তা দিচ্ছে।
অন্যদিকে, হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত এমআরটি লাইন-৫ উত্তর লাইন প্রকল্পের ব্যয় ১২৬ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রকল্পের নতুন ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সালের অনুমোদিত ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৫১ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা বেশি। ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রুটে সাড়ে তেরো কিলোমিটার পাতাল এবং সাড়ে ছয় কিলোমিটার উড়াল পথ রাখা হয়েছে। মোট চৌদ্দটি স্টেশনের সমন্বয়ে গঠিত এই রুটটি প্রতিদিন সাড়ে পাঁচ লাখ যাত্রী পরিবহন করবে বলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় ঠিকাদারদের চাওয়া উচ্চ দর এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের তারতম্যকেই ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।









