চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ সামলাতে ওয়ার্ডের বাইরে মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে। এর মধ্যেই দেখা গেছে ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগের চিত্র। একটি মাল্টিপ্লাগ থেকে একাধিক মাল্টিপ্লাগে সংযোগ নিয়ে চালানো হচ্ছে বৈদ্যুতিক পাখা ও নেবুলাইজার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগী ও স্বজনদের মাথার ওপর দিয়েই ঝুলছে তার ও মাল্টিপ্লাগ। এতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, শর্টসার্কিট কিংবা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৃতীয় তলায় মেডিসিন ও রেডিওলজি ওয়ার্ডের মাঝের চলাচলের জায়গায় এমন দৃশ্য দেখা যায়। জায়গাটি মূলত রোগী ও তাঁদের স্বজনদের চলাচল এবং অপেক্ষার জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা। কিন্তু মেডিসিন ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সেটিই এখন অনেক রোগীর অস্থায়ী শয্যায় পরিণত হয়েছে।
হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ওই জায়গায় ১০ থেকে ১২ জন রোগী মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাঁদের পাশে অবস্থান করছেন স্বজনেরা। কেউ স্যালাইন নিচ্ছেন, কেউ বিশ্রাম নিচ্ছেন। আবার কারও শারীরিক অবস্থার কারণে নেবুলাইজার ব্যবহারের প্রয়োজন হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই রোগীদের খুব কাছ দিয়ে বৈদ্যুতিক তার ও একাধিক মাল্টিপ্লাগের সংযোগ নেওয়া হয়েছে।
রেডিওলজি ওয়ার্ডে প্রবেশের আগে একটি বড় পিলারের পাশে স্যালাইনের পাইপের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে একটি মাল্টিপ্লাগ। সেখান থেকেই আরও কয়েকটি মাল্টিপ্লাগে সংযোগ নেওয়া হয়েছে। এসব সংযোগে বৈদ্যুতিক পাখা ও নেবুলাইজার চালানো হচ্ছে। মূল সংযোগটি নেওয়া হয়েছে মেডিসিন ওয়ার্ডের ভেতর থেকে।
সেখানে থাকা সাতজন রোগী ও তাঁদের স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূল মাল্টিপ্লাগটি আগে থেকেই ওই স্থানে ছিল। মেঝেতে থাকা রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত পাখার ব্যবস্থা না থাকায় স্বজনেরা নিজেদের উদ্যোগে পাখা কিনে এনেছেন। পরে ওই মাল্টিপ্লাগ থেকেই বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছেন তাঁরা। বাইরে আলাদা বৈদ্যুতিক বোর্ড না থাকায় ওয়ার্ডের ভেতরের সংযোগ ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে জানান তাঁরা।
একজন রোগীর স্বজন বলেন, গরমে মেঝেতে থাকা রোগীর কষ্ট হয়। তাই বাইরে থেকে পাখা কিনে এনে কোনোভাবে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছেন তাঁরা। নেবুলাইজারের প্রয়োজন হলেও একই সংযোগ ব্যবহার করতে হয়।
মেঝেতে থাকা রোগীদের একজন জন্ডিসে আক্রান্ত। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দুই স্বজন। তাঁদের মাথার ওপরেই ঝুলছিল একটি মাল্টিপ্লাগ। সেখান থেকে নেওয়া একাধিক সংযোগে বৈদ্যুতিক পাখা ও নেবুলাইজার চলছিল। রোগী ও স্বজনদের অবস্থানের এত কাছাকাছি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রোগীর অতিরিক্ত চাপের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, প্রতিদিনই নির্ধারিত শয্যার তুলনায় বেশি রোগী ভর্তি হন। ফলে সব রোগীকে ওয়ার্ডের নির্ধারিত শয্যায় রাখা সম্ভব হয় না। রোগীকে ফিরিয়ে না দিয়ে তাঁদের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে ওয়ার্ডের বাইরে মেঝেতেও রাখতে হয়।
তবে রোগীর স্বজনদের এভাবে নিজেদের উদ্যোগে বৈদ্যুতিক সংযোগ নেওয়া নিরাপদ নয় বলে মনে করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কারণ একটি মাল্টিপ্লাগ থেকে একাধিক মাল্টিপ্লাগে সংযোগ নেওয়ার ফলে একই লাইনে একাধিক বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো হচ্ছে। এর সঙ্গে রোগীদের বিছানা, স্যালাইনের ব্যবস্থা এবং চলাচলের জায়গা কাছাকাছি থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, অনেক সময় রোগীর স্বজনেরা সমস্যার কথা দায়িত্বপ্রাপ্তদের না জানিয়ে নিজেরাই বৈদ্যুতিক সংযোগের ব্যবস্থা করেন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে অবৈতনিক কর্মচারীদের টাকা দিয়ে এসব সংযোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে হাসপাতালের নির্ধারিত বৈদ্যুতিক নিরাপত্তাব্যবস্থার বাইরে গিয়ে সংযোগ তৈরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিনই শয্যার তুলনায় বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। শয্যায় জায়গা না থাকলেও তাঁদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে হয়। এ কারণে অনেক রোগীকে ওয়ার্ডের বাইরে রাখতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, রোগীর স্বজনেরা বিষয়টি না বুঝে এভাবে বৈদ্যুতিক সংযোগ নিয়ে থাকেন। এতে দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভিযান পরিচালনা করবে।
হাসপাতালের মতো স্থানে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার বিষয়টি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে মেঝেতে থাকা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মাথার ওপর কিংবা চলাচলের জায়গায় যদি এভাবে একাধিক তার ও মাল্টিপ্লাগ ঝুলে থাকে, তাহলে দুর্ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও এসব সংযোগ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একদিকে শয্যার সংকট, অন্যদিকে রোগীর স্বজনদের নিজ উদ্যোগে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা—দুই বাস্তবতা মিলিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই চিত্র সামনে এসেছে। রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগগুলো সরিয়ে অনুমোদিত ও নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় রোগীদের প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়াই এখন সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।










