খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৪:৫৬ এএম

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ভয়াবহ ডামাডোলের মাঝে মাঝে এমন কিছু মানবিক ও অলৌকিক গল্প সামনে আসে, যা রূপকথার কাহিনীকেও হার মানায়। ইউক্রেনীয় সেনাসদস্য নাজার দালিটস্কি তেমনই এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। যে সন্তানকে যুদ্ধের ময়দানে নিহত ভেবে প্রায় দুই বছর আগে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবরস্থ করা হয়েছিল, সেই ছেলেই দীর্ঘ কারাবাস শেষে হঠাৎ ফোন করে মাকে জানালেন— “মা, আমি বেঁচে আছি।” এক শোকার্ত মায়ের কাছে এর চেয়ে বড় কোনো ঐশ্বরিক উপহার আর কী হতে পারে!
Table of Contents
২০২২ সালে যখন রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ শুরু করে, তখন ৪২ বছর বয়সী নাজার দালিটস্কি কোনো দ্বিধা ছাড়াই রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২০১৪ সালের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি ছিলেন সম্মুখ সারির যোদ্ধা। কিন্তু যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে ২০২২ সালের মে মাসে তিনি হঠাৎ নিখোঁজ হন। এরপর শুরু হয় পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অনিশ্চয়তার প্রহর।
নিখোঁজ হওয়ার কিছুকাল পর নাজারের মা নাতালিয়া রুশ ভাষায় কথা বলা এক অজ্ঞাত ব্যক্তির কাছ থেকে ফোন পান। সেই ব্যক্তি কেবল জানিয়েছিলেন যে নাজার বন্দী আছেন, তবে বিস্তারিত কিছু বলেননি। সরকারি কোনো তথ্য না থাকায় পরিবারটি সেই আশ্বাসে ভরসা রাখতে পারছিল না।
নিখোঁজ হওয়ার এক বছর পর নাতালিয়াকে জানানো হয়, একটি ডিএনএ নমুনার ভিত্তিতে দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের মর্গ থেকে নাজারের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। মরদেহটি ছিল একটি পুড়ে যাওয়া বাসের ভেতরে পাওয়া কয়েকটি দেহের একটি। দেহটি মারাত্মকভাবে দগ্ধ হওয়ায় চেনার কোনো উপায় ছিল না। ডিএনএ তথ্যের ভিত্তিতে পরিবারটি নিশ্চিত হয় যে এটিই নাজার। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে ২০২৩ সালে পশ্চিম ইউক্রেনের এক গ্রাম্য কবরস্থানে নাজার ভেবে অন্য একজনের মরদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেন তাঁরা।
| সময়কাল | ঘটনার বিবরণ |
| ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হলে অভিজ্ঞ যোদ্ধা হিসেবে নাজারের যুদ্ধে যোগদান। |
| মে ২০২২ | রণাঙ্গন থেকে নাজার নিখোঁজ হন এবং পরিবারের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। |
| ২০২৩ সাল | ডিএনএ টেস্টের ভিত্তিতে মৃতদেহ শনাক্তকরণ এবং নাজারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন। |
| সেপ্টেম্বর ২০২৫ | মুক্তি পাওয়া এক সহযোদ্ধার মাধ্যমে নাজারের বেঁচে থাকার খবর পান মা নাতালিয়া। |
| ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | বন্দিবিনিময়ের আওতায় রুশ বন্দিশালা থেকে মুক্তি এবং দীর্ঘ ৩ বছর ৯ মাস পর বাড়ি ফেরা। |
চলতি সপ্তাহে নাজারের ফোনটি যখন আসে, তখন নাতালিয়ার কানে সেটি ছিল এক অলৌকিক সুর। নাজার অত্যন্ত দুর্বল ও শ্রান্ত কণ্ঠে তাঁর মাকে জানান, তিনি বন্দিবিনিময়ের মাধ্যমে ইউক্রেনের মাটিতে পা রেখেছেন। ফোনের ওপাশে থাকা মা নাতালিয়া এবং চাচাতো বোন রোকসোলানার আনন্দের চিৎকার ও কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। মা বারবার জানতে চাচ্ছিলেন, “বাবা, তোমার হাত-পা সব ঠিক আছে তো?”
পরিবারটি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গ্রামের ‘নিহত বীরদের’ তালিকা থেকে নাজারের ছবি ও তথ্য সরিয়ে ফেলার কাজে ব্যস্ত, যাতে ঘরে ফিরে তিনি মানসিকভাবে আঘাত না পান। যে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে ভুল মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছিল, তা নিয়ে এখন তদন্ত চলছে।
ইউক্রেনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যার একটি বড় অংশই সেনাসদস্য। নাজারের এই ফিরে আসা সেই হাজার হাজার পরিবারের জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে যারা প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় আছেন কিংবা ফিরে আসার স্বপ্ন দেখেন। নাতালিয়া তাঁর ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন এবং তাঁর প্রার্থনা— “সব মা যেন এমন একটি আনন্দময় ফোনকল পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।”
নাজার দালিটস্কি কেবল একজন সৈনিক নন, তিনি এখন ইউক্রেনীয়দের কাছে হার না মানা জীবনের এক জীবন্ত প্রতীক।
মন্তব্য