পুরুষদের প্রোস্টেট ক্যানসার বৃদ্ধি: লক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসা

বর্তমান বিশ্বে পুরুষদের স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রোস্টেট ক্যানসার। একসময় উন্নত দেশগুলোতে এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা গেলেও, বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশে প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, অনিয়ন্ত্রিত নগরজীবন, চর্বিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস এবং সচেতনতার অভাব এই রোগের বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। তবে আশার কথা হলো, প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা গেলে এই ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।

বাংলাদেশে প্রোস্টেট ক্যানসারের বর্তমান পরিস্থিতি

গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রোস্টেট ক্যানসার নির্ণয় ও চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। পূর্বে এই রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা থাকলেও এখন দেশের ভেতরেই আধুনিক সব সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। পিএসএ (প্রোস্টেট স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন) পরীক্ষা এখন জেলা শহরগুলোতেও সহজলভ্য। এছাড়া উন্নত রোগ নির্ণয় পদ্ধতি যেমন মাল্টি-প্যারামেট্রিক এমআরআই এবং ট্রাস গাইডেড বায়োপসি এখন দেশের বড় হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত হচ্ছে। তবে পিএসএমএ পিইটি-সিটি স্ক্যানের মতো অতি আধুনিক প্রযুক্তি এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।


প্রোস্টেট ক্যানসারের প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গ

প্রোস্টেট ক্যানসার সাধারণত নিঃশব্দে শরীরে বাসা বাঁধে। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তবে রোগটি কিছুটা অগ্রসর হলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:

লক্ষণের ধরনবিস্তারিত বিবরণ
প্রস্রাবের সমস্যাপ্রস্রাব শুরু করতে দেরি হওয়া, প্রবাহ দুর্বল হওয়া বা থেমে থেমে প্রস্রাব হওয়া।
অসম্পূর্ণ অনুভূতিপ্রস্রাব শেষ করার পরও মনে হওয়া যে মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হয়নি।
ঘন ঘন প্রস্রাববিশেষ করে রাতে বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া এবং নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা হওয়া।
রক্তের উপস্থিতিপ্রস্রাব বা বীর্যের সঙ্গে রক্তের উপস্থিতি লক্ষ্য করা।
ব্যথা ও অস্বস্তিতলপেটে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা মলদ্বারের আশেপাশে অস্বস্তি অনুভব করা।
হাড়ের ব্যথাক্যানসার ছড়িয়ে পড়লে মেরুদণ্ড, কোমর বা উরুর হাড়ে তীব্র ব্যথা হতে পারে।

আধুনিক চিকিৎসা ও প্রযুক্তির ব্যবহার

প্রোস্টেট ক্যানসার চিকিৎসায় বর্তমানে রেডিওথেরাপিকে সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশে এখন আন্তর্জাতিক মানের লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর মেশিন ব্যবহার করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ইমেজ-গাইডেড রেডিওথেরাপি (IGRT) পদ্ধতিতে ক্যানসার আক্রান্ত টিউমারে নিখুঁতভাবে রেডিয়েশন দেওয়া সম্ভব হয়, যার ফলে আশেপাশের সুস্থ কোষ বা অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। এছাড়া ‘হাইপোফ্র্যাকশনেশন’ পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসার সময়সীমা কমিয়ে আনা হয়েছে, যা রোগীর শারীরিক ও আর্থিক ভোগান্তি লাঘব করছে।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়

চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি হলেও এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। দেশের বেশিরভাগ আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র ঢাকা বা বড় শহরকেন্দ্রিক। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগ নিয়ে সচেতনতা খুবই কম, ফলে রোগীরা যখন চিকিৎসকের কাছে আসেন তখন ক্যানসার অনেক ক্ষেত্রে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। দক্ষ রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট এবং মেডিক্যাল ফিজিসিস্টের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০ বছর পার হওয়া প্রতিটি পুরুষের বছরে অন্তত একবার পিএসএ পরীক্ষা করা উচিত। যদি পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকে, তবে ৪৫ বছর বয়স থেকেই নিয়মিত স্ক্রিনিং করা জরুরি। সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ এবং আধুনিক চিকিৎসার সমন্বয় ঘটলে প্রোস্টেট ক্যানসার জয় করা সম্ভব।