দেশের আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং টাকার মান স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে বাজার থেকে আবারও ডলার সংগ্রহের পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত রবিবার (২৮ ডিসেম্বর), কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে দেশের তিনটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ১১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্রয় করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা কমানোর ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিনিময় হার ও ডলার সংগ্রহের বিবরণ
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রবিবারের নিলামে প্রতিটি ডলার ১২২.৩০ টাকা দরে কেনা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এবং রপ্তানি আয়ের প্রবাহ সন্তোষজনক থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ডলারের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। বাজারের এই উদ্বৃত্ত ডলার সংগ্রহের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে যেমন রিজার্ভের পরিমাণ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার মানে বড় কোনো ওঠানামা রোধ করার চেষ্টা করছে।
নিচে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস এবং চলতি অর্থবছরের ডলার ক্রয়ের পরিসংখ্যানগত চার্ট প্রদান করা হলো:
| সময়কাল | ডলার ক্রয়ের মোট পরিমাণ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) | বিনিময় হার (প্রতি ডলার) |
| ২৮ ডিসেম্বর (একদিনে) | ১১৫.০০ মিলিয়ন ডলার | ১২২.৩০ টাকা |
| ডিসেম্বর ২০২৫ (পুরো মাস) | ৯২০.৫০ মিলিয়ন ডলার | বাজার দর অনুযায়ী |
| ২০২৫-২৬ অর্থবছর (বর্তমান পর্যন্ত) | ৩,০৪৬.৫০ মিলিয়ন ডলার | নির্ধারিত নিলাম দর |
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় এই পদক্ষেপের গুরুত্ব
সাধারণত মুদ্রাবাজারে যখন ডলারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি হয়ে যায়, তখন ডলারের দাম দ্রুত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ডলারের দাম অতিরিক্ত কমে গেলে রপ্তানিকারক এবং প্রবাসীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এই ভারসাম্যহীনতা রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে উদ্বৃত্ত ডলার কিনে নেয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি সংগ্রহ করা হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞ ও বাজার বিশ্লেষণ
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ডলার ক্রয় কার্যক্রম একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বর্তমানে আমদানির দায় পরিশোধের চাপ আগের চেয়ে কিছুটা কম থাকায় বাজারে ডলারের তারল্য বেড়েছে। ১২২.৩০ টাকা দরে ডলার কেনার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি স্থিতিশীল মুদ্রানীতি বজায় রাখার সংকেত দিচ্ছে। আইএমএফ-এর শর্ত অনুযায়ী নিট রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই ধরণের কৌশল অত্যন্ত কার্যকর।
ভবিষ্যৎ গতিপথ
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বাজারের তারল্য পরিস্থিতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ পর্যবেক্ষণ করে আগামীতেও এ ধরণের নিলাম অব্যাহত রাখা হতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য টাকার মানকে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখাই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য। ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা ডলারের অতিরিক্ত প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে রিজার্ভ পুনর্গঠনের এই প্রক্রিয়া দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
