মালয়েশিয়ায় এমএসিসি প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল রাজপথ

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে রাজপথ আজ এক নজিরবিহীন বিক্ষোভের সাক্ষী হয়েছে। দেশটির দুর্নীতি দমন কমিশন (এমএসিসি)-এর প্রধান কমিশনার আজম বাকির বিরুদ্ধে ওঠা শেয়ার কেলেঙ্কারির অভিযোগ এবং তাঁর বিতর্কিত অবস্থানের প্রতিবাদে শত শত বিক্ষোভকারী সমবেত হন। কালো পোশাক পরিহিত এই বিক্ষোভকারীরা অবিলম্বে আজম বাকির পদত্যাগ এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এই আন্দোলন বর্তমানে মালয়েশিয়ার জোট সরকারের সংস্কারবাদী ভাবমূর্তির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট ও দাবি

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারপন্থী প্রভাবশালী সংগঠন ‘বারসিহ’-এর আহ্বানে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, আজম বাকি সরকারি চাকরিবধিবহির্ভূতভাবে বিপুল পরিমাণ শেয়ার ধারণ করেছেন, যা সরাসরি স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা সরকারের “নরম” প্রতিক্রিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা সরকারের উচিত ছিল অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।

বিক্ষোভকারীদের পরিহিত কালো পোশাক তাদের ভাষায়—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া “গভীর পচনের” প্রতীক। তাঁরা দাবি করেন, যে সংস্থার কাজ দুর্নীতি রোধ করা, সেই সংস্থার প্রধানই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হন, তবে সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে।

দুর্নীতির অভিযোগ ও আইনি সীমা

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন আজম বাকির বিরুদ্ধে জনরোষের আগুনে ঘি ঢেলেছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে তিনি তাঁর পদের জন্য নির্ধারিত সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মূল্যের শেয়ার ধারণ করেছেন। মালয়েশিয়ার সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী শেয়ার মালিকানার নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

টেবিল: মালয়েশিয়ার সরকারি কর্মকর্তাদের শেয়ার ধারণের আইনি সীমা

মাপকাঠিনির্ধারিত সীমাঅভিযোগের বর্তমান অবস্থা
সর্বোচ্চ আর্থিক মূল্য১ লাখ রিঙ্গিত (ক্রয়ের সময়কার মূল্য)অভিযোগ অনুসারে এই সীমা কয়েক গুণ অতিক্রম করেছেন।
পরিশোধিত মূলধনের হার৫ শতাংশের কমআজম বাকি ও তাঁর ভাইয়ের অ্যাকাউন্টে বিপুল শেয়ারের তথ্য মিলেছে।
তদন্তের স্থিতিচলমানবিশেষ টাস্কফোর্স তদন্ত শুরু করলেও তিনি স্বপদে বহাল আছেন।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও সংহতি

সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা রাফিজি রামলী। তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, “ক্ষমতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে গত দুই দশকের দীর্ঘ লড়াই-ই আজকের সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। জনগণের এই আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই।”

সেতিয়াওয়াংসা আসনের সংসদ সদস্য নাইক নাজমি নাইক আহমেদ মনে করিয়ে দেন যে, ২০২২ সালেও আজম বাকির শেয়ার মালিকানা নিয়ে প্রথম বিতর্ক শুরু হয়েছিল। সে সময় খোদ আনোয়ার ইব্রাহিম বিরোধী দলে থাকাকালীন এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন এবং সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন। এখন আনোয়ার ইব্রাহিম প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় কেন আজম বাকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেরি হচ্ছে, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।

আজম বাকির অবস্থান ও বর্তমান পরিস্থিতি

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন আজম বাকি। তিনি দাবি করেছেন, তিনি কোনো আইন ভঙ্গ করেননি এবং বিষয়টি তাঁর ক্যারিয়ার ও সুনাম নষ্ট করার একটি চক্রান্ত। এই অভিযোগে তিনি সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মানহানির মামলাও দায়ের করেছেন। তবে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনের পর গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স যখন তদন্ত শুরু করেছে, তখন নীতিগত কারণে তাঁর ছুটিতে যাওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু তিনি তদন্তকালীন ছুটিতে যেতে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে আজম বাকির এই জেদ এবং সরকারের ধীরগতির পদক্ষেপ মালয়েশিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। কুয়ালালামপুরের রাজপথ থেকে শুরু হওয়া এই পদত্যাগের দাবি এখন পুরো দেশে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক বৃহৎ আন্দোলনে রূপ নিতে যাচ্ছে।