এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সংগীতস্রষ্টাদের নিয়ে গঠিত এপিএমএর নতুন নির্বাহী কমিটিতে মোট ১১ জন সদস্য রয়েছেন। বাংলাদেশ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ভারতের প্রতিনিধিরা এই কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক এই সংগঠনের কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সংগীতস্রষ্টাদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিজের এই অর্জনকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখছেন না হামিন আহমেদ। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
নতুন দায়িত্ব প্রসঙ্গে হামিন আহমেদ বলেন, ‘এ অর্জন বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের জন্য নিঃসন্দেহে অনেক আনন্দের। নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে স্বীকৃতি পেলাম, তা বাংলাদেশের জন্যও প্রথম। এশিয়া-প্যাসিফিকের বিভিন্ন কার্যক্রমে এখন বাংলাদেশের সংগীতস্রষ্টারা যুক্ত হতে পারবেন। তথ্য বিনিময় ও এই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আমাদের সংগীতাঙ্গনের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক হবে।’
সংগীতস্রষ্টাদের অধিকার, মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে এপিএমএ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংগীতস্রষ্টাদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরিতেও এই আঞ্চলিক জোটের ভূমিকা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংগীতস্রষ্টাদের সংগঠন সিআইএএম এবং মেধাস্বত্ব ব্যবস্থাপনার বিশ্ব সংস্থা সিস্যাকের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে এপিএমএ। ২০১৬ সালের নভেম্বরে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ক্রিয়েটরস ফোরামে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটি।
বর্তমান সময়ে সংগীতস্রষ্টাদের মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ ও ন্যায্য সম্মানী নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রযুক্তির বিকাশের ফলে গান প্রকাশ, প্রচার ও শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এর সঙ্গে সংগীতের স্বত্ব, রয়্যালটি বা প্রাপ্য সম্মানী এবং সৃষ্টিকর্মের যথাযথ মূল্যায়নের বিষয়গুলোও নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে।
এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সংগীতস্রষ্টাদের যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করা হয়। এপিএমএর নির্বাহী কমিটিতে হামিন আহমেদের অন্তর্ভুক্তি সেই যোগাযোগ সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের সংগীতস্রষ্টাদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা এবং মেধাস্বত্ব ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
হামিন আহমেদ বর্তমানে বাংলাদেশ লিরিসিস্টস, কম্পোজার্স অ্যান্ড পারফর্মারস সোসাইটির (বিএলসিপিএস) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংগীত পরিবেশনার পাশাপাশি সংগীতস্রষ্টাদের অধিকার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে হামিন আহমেদ একটি সুপরিচিত নাম। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশের সংগীতাঙ্গনে তাঁর অবদান রয়েছে। বিশেষ করে জনপ্রিয় ব্যান্ড মাইলসের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের সঙ্গে তাঁর নাম নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।
১৯৭৯ সালে ফরিদ রশিদের হাত ধরে হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদ গড়ে তোলেন মাইলস। প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে ব্যান্ডটি বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে। শুরুর দিকে ইংরেজি গান নিয়ে কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে বাংলা গানের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে দলটি।
দুটি ইংরেজি গানের অ্যালবাম প্রকাশের পর ১৯৯১ সালে বাজারে আসে মাইলসের প্রথম বাংলা অ্যালবাম ‘প্রতিশ্রুতি’। এই অ্যালবাম প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে নতুনভাবে পরিচিতি পেতে শুরু করে মাইলস। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে ব্যান্ডটির জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
এরপর একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে দেশের ব্যান্ডসংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নেয় দলটি। ‘চাঁদ তারা সূর্য’, ‘প্রথম প্রেমের মতো’, ‘গুঞ্জন শুনি’, ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘ধিকি ধিকি’, ‘পাহাড়ি মেয়ে’, ‘নীলা’ ও ‘পিয়াসী মন’সহ অসংখ্য গান মাইলসকে শ্রোতাদের কাছে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।
এসব গান বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছেও মাইলসের বহু গান সমানভাবে পরিচিত। দীর্ঘ সংগীতজীবনে ব্যান্ডটি দেশের আধুনিক সংগীতধারার বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
মাইলসের সর্বশেষ অ্যালবাম ‘প্রতিচ্ছবি’ প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে। সংগীতচর্চার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে হামিন আহমেদ এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংগীতস্রষ্টাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এপিএমএর নির্বাহী কমিটিতে তাঁর নির্বাচন দেশের সংগীতাঙ্গনের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সংগীতস্রষ্টাদের অধিকারসংক্রান্ত কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে এই অর্জনের মধ্য দিয়ে।









