যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় দেশের অ-জীবন বীমা খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতদিন আইন অনুযায়ী, অ-জীবন বীমা কোম্পানিগুলোকে তাদের মোট পুনর্বিমা ব্যবসার কমপক্ষে ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশন (এসবিসি)-এর কাছে হস্তান্তর করতে হতো। নতুন চুক্তির ফলে এই বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হবে।
পুনর্বিমা বলতে বোঝায় ‘বীমা কোম্পানির জন্য বীমা’। অর্থাৎ, বড় ধরনের ঝুঁকি—যেমন কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, জাহাজ বা কার্গো ক্ষতি—এককভাবে বহন না করে বীমা কোম্পানিগুলো অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সেই ঝুঁকি ভাগ করে নেয়। এতে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ পরিশোধে আর্থিক স্থিতি বজায় রাখা সহজ হয়।
বর্তমান ব্যবস্থায়, পুনর্বিমার অন্তত অর্ধেক এসবিসির মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়; অবশিষ্ট অংশ দেশি বা বিদেশি পুনর্বিমা প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া যায়। তবে গত বছরের নভেম্বরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) ‘ইনস্যুরেন্স করপোরেশন আইন, ২০১৯’-এর সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধনের প্রস্তাব তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক-সংক্রান্ত সমঝোতার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ওয়াশিংটন প্রথমে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়। পরে তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়, যা আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত সর্বশেষ চুক্তিতে এই হার আরও কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আগে এ বিষয়ে খোলাখুলি মন্তব্য না করলেও সম্প্রতি একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে পুনর্বিমা শর্ত শিথিলকরণ ছিল শুল্ক হ্রাসের শর্তগুলোর একটি।
বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছিল। তাদের অভিযোগ, এসবিসিতে পুনর্বিমা দাবির নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে; কিছু দাবি ২০২০ সাল থেকে ঝুলে আছে, ফলে গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে বিলম্ব হচ্ছে। তারা মনে করে, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা চালু হলে আন্তর্জাতিক পুনর্বিমা বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
অন্যদিকে, এসবিসি বাধ্যতামূলক ধারা বাতিলের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এফআইডিকে চিঠি দিয়েছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, বাধ্যতামূলক ব্যবসা না থাকলে তাদের আয়ের একটি স্থিতিশীল উৎস কমে যেতে পারে।
সাধারণ বীমা করপোরেশনের সাম্প্রতিক আর্থিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
| সূচক | ২০২৩ অর্থবছর | ২০২৪ অর্থবছর | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| কর-পরবর্তী নিট মুনাফা | ২৬২.৫ কোটি টাকা | ২৯৭.৬ কোটি টাকা | +১৩% |
| শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) | ৫২.৫১ টাকা | ৩৩.০৭ টাকা | -৩৭% |
| অবাস্তবায়িত শেয়ার ক্ষতি | — | ৮৬২ কোটি টাকা | — |
| মোট সমন্বিত আয় | ইতিবাচক | ঋণাত্মক | অবনতি |
যদিও ২০২৪ অর্থবছরে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১৩ শতাংশ বেড়েছে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের অবাস্তবায়িত ৮৬২ কোটি টাকার ক্ষতির কারণে মোট সমন্বিত আয় ঋণাত্মক হয়েছে। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয়ও ৩৭ শতাংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাধ্যতামূলক পুনর্বিমা শর্ত প্রত্যাহার করলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, বিদেশি পুনর্বিমা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে এবং ঝুঁকি বণ্টনে বহুমাত্রিকতা আসবে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতি ও নীতিগত ভারসাম্য রক্ষায় সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে, এই সিদ্ধান্ত কেবল বীমা খাতেই নয়, বরং বৃহত্তর বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কৌশলের একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
