ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। চোখে লাইট মারার প্রতিবাদ করায় একদল দুর্বৃত্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবারে হামলা চালিয়ে বাবা ও ছেলেকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছে। ঘটনাটি উপজেলার আলগী ইউনিয়নের পশ্চিম আলগী গ্রামে ঘটেছে। এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধার ছেলে শেখ মিরান (৪৫)। তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর ছোট ছেলে জিদান শেখ (১৬) আহত অবস্থায় ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ মিরানের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে এবং তিনি এখনো শঙ্কামুক্ত নন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে কয়েকজন দুর্বৃত্ত শেখ মিরানের বাড়ির সামনে এসে হৈচৈ শুরু করে এবং গেট ভাঙার চেষ্টা চালায়। ওই সময় শেখ মিরান বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না। বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে। কিছুক্ষণ পর শেখ মিরান বাড়িতে ফিরে এসে পরিস্থিতি দেখতে পান এবং দুর্বৃত্তদের এই আচরণের প্রতিবাদ করেন।
শেখ মিরানের বড় বোন খাদিজা বেগম জানান, “ভাই বাড়িতে ফিরেই জানতে চেয়েছিল, কেন তারা গেট ভাঙছে এবং এমন আচরণ করছে। এতে দুর্বৃত্তরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভাইয়ের ওপর হামলা চালায়।” তিনি আরও বলেন, “ভাইয়ের চিৎকার শুনে তার দুই ছেলে, এক ভাতিজা এবং কয়েকজন প্রতিবেশী এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তরা তাদের দিকেও তেড়ে আসে।”
স্থানীয়রা জানান, হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবেই দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এসেছিল। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। তবে গ্রামবাসীরা দ্রুত সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললে হামলাকারীদের একজন, রানা মুন্সি (২৮), ঘটনাস্থলেই আটক হয়। পরে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অন্য হামলাকারীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, হামলাকারীরা শেখ মিরানের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল বা অন্য যান থেকে তার চোখে সরাসরি লাইট মারে। এতে শেখ মিরান প্রতিবাদ করেন। এই লাইট মারাকে কেন্দ্র করেই প্রথমে কথা-কাটাকাটি এবং পরে তা সহিংসতায় রূপ নেয়। একপর্যায়ে দুর্বৃত্তরা মিরান শেখ ও তার ছেলেকে কুপিয়ে জখম করে।
পুলিশ জানায়, আটক রানা মুন্সিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্তে অভিযান চলছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, পশ্চিম আলগী গ্রাম সাধারণত শান্তিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। চোখে লাইট মারার মতো সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন নৃশংস হামলা মেনে নেওয়া যায় না। তাঁরা দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের সহিংসতা সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। ব্যক্তিগত সহনশীলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়ায় তুচ্ছ বিরোধও মারাত্মক রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ওপর হামলার বিষয়টি সামাজিকভাবে আরও সংবেদনশীল এবং নিন্দনীয় বলে মনে করছেন অনেকে।
নিচে ঘটনার সারসংক্ষেপ টেবিল আকারে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ঘটনা স্থান | পশ্চিম আলগী গ্রাম, আলগী ইউনিয়ন, ভাঙ্গা |
| ঘটনার সময় | শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টা |
| আহত | শেখ মিরান (৪৫), জিদান শেখ (১৬) |
| শেখ মিরানের অবস্থা | গুরুতর, ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি |
| জিদান শেখের অবস্থা | আহত, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি |
| হামলার কারণ | চোখে লাইট মারার প্রতিবাদ |
| আটক ব্যক্তি | রানা মুন্সি (২৮) |
| পুলিশি পদক্ষেপ | একজন আটক, অন্যদের ধরতে অভিযান |
এ ঘটনায় পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। তাঁরা আশা করছেন, দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে এবং এমন সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
