২০২৬ বিশ্বকাপের পর ব্যালন ডি’অরের হিসাব অনেকটাই বদলে গেছে। টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা অনেক তারকার সম্ভাবনাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। স্পেনের বিশ্বকাপজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা রদ্রি ও লামিন ইয়ামালের মতো খেলোয়াড়দের অবস্থানও বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের পর আরও আলোচিত হয়েছে।
তবে এখানেই শেষ নয়। নতুন ক্লাব মৌসুমের পারফরম্যান্সও পুরস্কারের চূড়ান্ত হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের পর ক্লাবের হয়ে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারা খেলোয়াড়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বর্তমান আলোচনায় বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে দুর্দান্ত গোলস্কোরিং মৌসুম কাটানো হ্যারি কেইন এগিয়ে আছেন। তার পরেই রয়েছে কিলিয়ান এমবাপ্পে, লামিন ইয়ামাল, রদ্রি ও লিওনেল মেসির মতো তারকার নাম।
৫. লিওনেল মেসি
৩৯ বছর বয়সেও লিওনেল মেসির নাম ব্যালন ডি’অরের সম্ভাব্য বিজয়ীদের আলোচনায় থাকা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর হতে পারে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স আবারও দেখিয়েছে, বয়স সত্ত্বেও বড় মঞ্চে তিনি কতটা কার্যকর হতে পারেন।
আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে আট গোল করেছেন মেসি এবং দলকে ফাইনালে তুলেছেন। একপর্যায়ে তিনিই ছিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। পরে কিলিয়ান এমবাপ্পে তাকে ছাড়িয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয় আর্জেন্টিনার।
আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিততে পারলে মেসির অবস্থান আরও শক্ত হতে পারত। ২০২৩ সালের ব্যালন ডি’অরও তিনি জিতেছিলেন, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের প্রায় ১০ মাস পর। সেই সময় তিনি ইন্টার মিয়ামির হয়ে খেলছিলেন।
এবারও বিশ্বকাপে আট গোল, আন্তর্জাতিক ফুটবলে দীর্ঘদিনের প্রভাব এবং ইন্টার মিয়ামির হয়ে ক্যাম্পিওনেস কাপ জয়ে অবদান—সব মিলিয়ে মেসি আলোচনার বাইরে থাকছেন না। ইন্টার মিয়ামির অন্যতম মালিক ডেভিড বেকহামও তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সমর্থন করেছেন।
৪. রদ্রি
স্পেনের বিশ্বকাপজয়ে মাঝমাঠের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন রদ্রি। রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি আক্রমণের সূচনা, বলের নিয়ন্ত্রণ এবং দলের খেলার গতি ধরে রাখতে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে গোল্ডেন বলও জিতেছেন রদ্রি। ফলে বিশ্বকাপের পর ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে তার অবস্থান বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।
তবে ক্লাব ফুটবলে গত মৌসুমটা তার জন্য খুব একটা মসৃণ ছিল না। চোট থেকে ফিরে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে সময় লেগেছে। সিটি এফএ কাপ ও লিগ কাপ জিতলেও প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জিততে পারেনি।
নতুন মৌসুমে বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পরও রদ্রির ম্যাচে সম্পূর্ণ সময় মাঠে থাকার সুযোগ সীমিত ছিল। প্রথম ছয় ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে পুরো ৯০ মিনিট খেলেছেন তিনি। ফলে বিশ্বকাপে পাওয়া সাফল্যের সঙ্গে ক্লাব ফুটবলের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এখনো পুরোপুরি যোগ করতে পারেননি এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার।
৩. লামিন ইয়ামাল
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলে দুটিতেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কীর্তি গড়েছেন লামিন ইয়ামাল। ২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অরে দ্বিতীয় হওয়া এই তরুণ এবার প্রথমবারের মতো পুরস্কার জয়ের অন্যতম আলোচিত দাবিদার।
বিশ্বকাপে গোল ও অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যান তার স্বাভাবিক মানদণ্ড অনুযায়ী খুব বেশি ছিল না। তবে স্পেনের পুরো টুর্নামেন্ট অভিযানে তার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। আক্রমণে গতি, ড্রিবলিং এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার সক্ষমতা তাকে দলের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রে পরিণত করেছে।
বার্সেলোনার হয়ে গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২৪ গোলের পাশাপাশি ১৮টি অ্যাসিস্ট করেছেন ইয়ামাল। নতুন মৌসুমেও তার শুরুটা হয়েছে দুর্দান্ত। প্রথম সাত ম্যাচেই করেছেন আট গোল।
এমন পারফরম্যান্স অব্যাহত থাকলে ক্লাব ও জাতীয় দলের সাফল্য মিলিয়ে ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় ইয়ামালের অবস্থান আরও জোরালো হতে পারে।
২. কিলিয়ান এমবাপ্পে
২৭ বছর বয়সে পা রাখলেও এখনো ব্যালন ডি’অরের ট্রফি হাতে ওঠেনি কিলিয়ান এমবাপ্পের। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে গোল করে যাওয়া এই ফরাসি তারকা এবারও পুরস্কারের অন্যতম বড় দাবিদার।
২০২৬ বিশ্বকাপে ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছেন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের তালিকায় মিরোস্লাভ ক্লোসেকে পেছনে ফেলে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে মোট গোলের সংখ্যায় মেসিকেও ছাড়িয়ে গেছেন।
গোল্ডেন বলের লড়াইয়েও এমবাপ্পের সঙ্গে মেসির নাম ছিল আলোচনায়।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গত মৌসুমে নানা চাপের মধ্যেও গোল করার ধারায় বড় কোনো ছেদ পড়েনি তার। ৪৪ ম্যাচে করেছেন ৪২ গোল। যদিও রিয়াল মাদ্রিদ বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেনি, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের বিচারে এমবাপ্পের মৌসুম ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল।
বিশ্বকাপে ১০ গোলের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলে তার গোলের ধারাবাহিকতা ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করার অন্যতম বড় উপাদান।
১. হ্যারি কেইন
বিশ্বকাপে নিজের সেরা ছন্দে না থাকলেও ব্যালন ডি’অরের বর্তমান আলোচনায় শীর্ষে রয়েছেন হ্যারি কেইন। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে তার অসাধারণ গোলস্কোরিং মৌসুম।
গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫১ ম্যাচে ৬১ গোল করেছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক। তার গোলের ওপর ভর করে বায়ার্ন মিউনিখ লিগ ও কাপ—দুটি শিরোপাই জিতেছে। ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন তিনি।
বিশ্বকাপেও পুরোপুরি বিবর্ণ ছিলেন না কেইন। ছয় গোল করেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। এর মধ্যে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে করা জোড়া গোলও রয়েছে। তার পারফরম্যান্সের পথ ধরে ইংল্যান্ড ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা ফল পেয়েছে।
নতুন মৌসুমেও গোলের ধারায় আছেন কেইন। শেষ দুই ম্যাচে করেছেন দুটি গোল। ফলে ক্লাব ফুটবলে তার বর্তমান ছন্দ যদি ধরে থাকে, তাহলে বিশ্বকাপে এমবাপ্পে বা মেসির তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকা পারফরম্যান্সও সামলে নেওয়ার সুযোগ থাকবে তার।
ব্যালন ডি’অরের হিসাব অবশ্য শুধু একটি টুর্নামেন্ট বা কয়েকটি ম্যাচের ওপর নির্ভর করে না। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, দলীয় সাফল্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে খেলোয়াড়ের প্রভাব—সবই আলোচনায় আসে। সেই জায়গা থেকে বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর নতুন ক্লাব মৌসুমের প্রতিটি ম্যাচ এখন এই পাঁচ তারকার জন্যই বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে।









