ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ে গভর্নরের উদ্বেগ প্রকাশ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা কার্যত হারিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের এই বিপুল অর্থ বর্তমানে খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হলেও এর বড় অংশের বিপরীতে কার্যকর জামানত নেই এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের চতুর্দশ গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন। এ সময় তিনি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংক খাতের চ্যালেঞ্জ, আর্থিক খাত পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা এবং নতুন প্রণোদনা কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন।

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেন, “আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে ব্যাংক খাত থেকে ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়ে গেছে। ব্যাংকিং খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ এখন নেই। আমরা এটিকে মার্জিত ভাষায় এনপিএল বা খেলাপি ঋণ বলছি। কিন্তু বাস্তবে এই ঋণের বড় অংশের বিপরীতে কোনো কার্যকর জামানত নেই এবং অধিকাংশ অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, দেশের আর্থিক খাত বর্তমানে উল্লেখযোগ্য চাপের মধ্যে রয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমানতকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন সেই আস্থা পুনর্গঠনের কাজ করছে বলে জানান তিনি।

গভর্নরের ভাষ্য অনুযায়ী, “আমাদের আর্থিক খাত চাপের মধ্যে আছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। আমানতকারীদের আস্থা কমে গিয়েছিল। আমরা এখন সেই আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। তবে এটিকে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।”

খেলাপি ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত সম্পদ বা জামানত না থাকার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন গভর্নর। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ১০০ টাকা ঋণ নিয়েছে, তার কাছে সেই পরিমাণ সম্পদ নেই। এখন আমাদের কাজ হচ্ছে কীভাবে এই অর্থ আদায় করা যায়, সেটি নিশ্চিত করা।”

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর দেশের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই প্যাকেজের মূল লক্ষ্য হচ্ছে উৎপাদনশীল খাতকে সহায়তা দেওয়া, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই প্রণোদনা কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন বৃদ্ধি, রফতানি সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়তে পারে। এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনারও সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অতীতের বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচি নিয়ে সমালোচনা এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, “অতীতের অভিজ্ঞতা খুব একটা ইতিবাচক ছিল না, এটি সত্য। তবে এবার আমরা আগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনা করেছি।”

তিনি জানান, নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ চূড়ান্ত করার আগে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ এবং ক্ষুদ্রঋণ খাতের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের মতামতের ভিত্তিতেই প্যাকেজটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

গভর্নর বলেন, “আমরা এমনভাবে পুরো প্যাকেজটি ডিজাইন করেছি যাতে অতীতের মতো অনিয়ম বা অপব্যবহারের ঝুঁকি কম থাকে। এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।”

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, আমানতকারীদের উদ্বেগ এবং অর্থ পাচার নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ, পুনঃতফসিল এবং ঋণ আদায়ে দুর্বলতার কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নেতৃত্ব ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।