ভারতের বেঙ্গালুরুর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিক মোহাম্মদ আবদুল হাকিম সবুজের লাশ আট দিন আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। মৃতের পরিবারের দাবি, চিকিৎসার বকেয়া বিল পরিশোধ না করা পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশ হস্তান্তরে রাজি হয়নি। পরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহায়তায় ২৬ সেপ্টেম্বর সবুজের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নওগাঁর বাসিন্দা সবুজের বয়স হয়েছিল ৩২ বছর। তিনি বাংলাদেশে চুক্তিভিত্তিক সরকারি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কিডনির চিকিৎসার জন্য গত ৫ সেপ্টেম্বর স্ত্রী তানজিলা ইসলাম আশাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ভারতের বেঙ্গালুরু যান। পরদিন তাকে পুরনো বিমানবন্দর সড়কের মণিপাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তির পর সবুজের শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা বাড়তে থাকে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে হাসপাতালের দাবির ভিত্তিতে তার স্ত্রী মোট ৭ লাখ ৫০ হাজার রুপি পরিশোধ করেন বলে দাবি করেছেন।
তানজিলা ইসলাম আশার ভাষ্য, ১৪ সেপ্টেম্বর সবুজের ডান পায়ে সংক্রমণ দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকেরা তার ডান পা কেটে ফেলেন। এরপরও শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সবুজ মারা যান।
স্বামীর মৃত্যুর পর দেশে লাশ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেন তানজিলা। তখনই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বকেয়া বিল নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় বলে তার অভিযোগ। তার দাবি, হাসপাতাল চিকিৎসা বাবদ ৩৫ লাখ ৭৯ হাজার রুপি বকেয়া রয়েছে বলে জানায়। ওই অর্থ পরিশোধ না করলে লাশ হস্তান্তর করা হবে না বলেও তাকে জানানো হয়।
তানজিলা আরও অভিযোগ করেন, চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে পরিশোধ করা ৭ লাখ ৫০ হাজার রুপির বিপরীতে হাসপাতাল থেকে তাকে কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি। চিকিৎসার সম্ভাব্য মোট ব্যয় কত হতে পারে, সে বিষয়েও আগে থেকে তাকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি বলে দাবি তার।
এ অবস্থায় তিনি বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহায়তা চান। কয়েক দিন ধরে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগের পর ২৬ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবুজের লাশ হস্তান্তর করে। ফলে মৃত্যুর পর আট দিন হাসপাতালের হেফাজতে থাকার পর লাশ পরিবারের কাছে পৌঁছায়।
সবুজের সঙ্গে থাকা তার বন্ধু মোহাম্মদ মোক্তাদির হোসেনও ঘটনাটির বিষয়ে কথা বলেছেন। তার দাবি, আগে পরিশোধ করা ৭ লাখ ৫০ হাজার রুপি ছাড়া লাশ ছাড়িয়ে নিতে আর কোনো অর্থ দিতে হয়নি। স্থানীয় কয়েকজনের সহযোগিতায় তানজিলার পাসপোর্টও ফেরত পাওয়া যায় বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে, হাসপাতালের এক কর্মকর্তা সবুজের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বকেয়া বিল, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা অর্থ পরিশোধের রসিদ না দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।
পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক বিবৃতিতে সবুজের চিকিৎসার বিষয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, গুরুতর শ্বাসকষ্ট নিয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তার শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কম ছিল। আইসিইউতে নেওয়ার পর তার হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকেরা দুইবার তাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। পরবর্তী সময়ে কৃত্রিম হৃদ্ফুসফুস সহায়তা এবং শ্বাসযন্ত্রের মাধ্যমে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনাটি নিয়ে একদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসা ব্যয়, বিলের স্বচ্ছতা এবং লাশ হস্তান্তর নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। অন্যদিকে হাসপাতাল তাদের বিবৃতিতে সবুজের জটিল শারীরিক অবস্থা এবং তাকে দেওয়া চিকিৎসার বিবরণ তুলে ধরেছে। তবে বকেয়া অর্থের পরিমাণ, পূর্বে পরিশোধ করা অর্থের রসিদ এবং লাশ হস্তান্তরে বিল পরিশোধের শর্ত আরোপের অভিযোগ নিয়ে হাসপাতালের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
বিদেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় হাসপাতাল, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা হাইকমিশন এবং পরিবারের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হয়। সবুজের ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহায়তায় লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।









