বিসিএস ক্যাডারের জালিয়াতি: আদালতের নির্দেশে কারাগারে সেই আমলা

চাচাকে নিজের বাবা সাজিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিসিএস ক্যাডার হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) মো. কামাল হোসেনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। আজ বুধবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে এই আদেশ দেন। আদালতের এই আদেশের পর জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব পদমর্যাদার এই কর্মকর্তা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারককে উদ্দেশ্য করে শ্লেষাত্মকভাবে বলেন, ‘আমি কিন্তু একজন আমলা, আপনি সুবিচার করেননি।’ এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যে আদালত প্রাঙ্গণে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

মামলার প্রেক্ষাপট ও জামিন বাতিলের কারণ

দুদকের প্রসিকিউটরদের তথ্যমতে, আসামি কামাল হোসেন গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর উচ্চ আদালত থেকে চার সপ্তাহের আগাম জামিন পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২৩ ডিসেম্বর তিনি নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে তাঁকে জামিন দেওয়া হয়েছিল। তবে তদন্তে অসহযোগিতা এবং জামিনের শর্ত দুবার লঙ্ঘন করার কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর জামিন বাতিলের আবেদন জানায়। আদালত দীর্ঘ শুনানি শেষে আজ তাঁর স্থায়ী জামিন নাকচ করে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন।

আসামির আইনজীবী ও দুদকের আইনজীবীদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক শেষে যখন কারাগারে পাঠানোর আদেশ আসে, তখন কামাল হোসেন নিজের প্রশাসনিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ সদস্যরা তাঁকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কারাগারে নিয়ে যান।

জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্যসমূহ

দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. মনজুরুল ইসলাম বাদী হয়ে গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বর্ণিত জালিয়াতির তথ্যগুলো নিচে সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:

বিষয়প্রকৃত তথ্যজালিয়াতির তথ্য
পিতার নামমো. আবুল কাশেমবীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আহসান হাবীব (আপন চাচা)
মাতার নামমোছা. হাবীয়া খাতুনমোছা. সানোয়ারা খাতুন (চাচি)
শিক্ষাজীবন (৫ম ও ৮ম শ্রেণি)প্রকৃত মা-বাবার নাম ব্যবহৃত হয়েছে
শিক্ষাজীবন (৯ম শ্রেণি থেকে)চাচা-চাচিকে মা-বাবা সাজিয়ে রেজিস্ট্রেশন
উদ্দেশ্যসাধারণ নাগরিক হিসেবে সুযোগ-সুবিধামুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার লাভ
আইনি ধারাদণ্ডবিধি ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১জালিয়াতি, প্রতারণা ও জাল দলিল ব্যবহার

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে প্রতারণা

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া এই কর্মকর্তা কেবল চাকরির জন্যই নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগের উদ্দেশ্যেও এই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের বাসিন্দা কামাল হোসেন মাধ্যমিক পর্যায়ে রেজিস্ট্রেশনের সময় তাঁর প্রকৃত জন্মদাতার নাম পরিবর্তন করেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য বরাদ্দকৃত কোটা অবৈধভাবে দখলের এই ঘটনাকে ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে চরম প্রতারণা’ হিসেবে অভিহিত করেছে দুদক।

বর্তমানে ওএসডি অবস্থায় থাকা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। আদালতের আজকের এই কঠোর অবস্থান দুর্নীতি ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে একটি জোরালো বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।