,

বিশ্ববাজারের চেয়ে বেশি দামে কেনা হচ্ছে বাংলাদেশে এলএনজি

আন্তর্জাতিক বাজারের সূচক মূল্যের তুলনায় বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সরবরাহ সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাব এবং স্বল্প সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করার চাপ—সব মিলিয়ে স্পট বাজারে এলএনজি আমদানির ব্যয় বেড়ে গেছে। গত সপ্তাহে তিনটি কার্গো কিনতেই প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে পেট্রোবাংলা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব কার্গোতে আন্তর্জাতিক বাজারের জাপান-কোরিয়া মূল্যসূচক বা জেকেএমের তুলনায় অন্তত ৩০০ কোটি টাকা বেশি দিতে হয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পট বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় অন্তত ২০টি কার্গো সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে আগামী তিন মাসে সরবরাহ দিতে আগ্রহী কোম্পানির কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, এলএনজি সরবরাহের বৈশ্বিক বাজার এখন বহু বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। এই বাজারে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বাড়ছে বলেও সরকারের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে গ্যাস সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। চুক্তির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সরবরাহ পাওয়া না গেলে শেষ ভরসা হিসেবে স্পট বাজারে যেতে হবে।

যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ সংকট

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারে অস্থিরতা আরও বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার, ওমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির কাছ থেকে যে সরবরাহ পাওয়ার কথা ছিল, তার কিছু অংশ স্থগিত হয়েছে। ফলে দেশের চাহিদা মেটাতে স্পট বাজার থেকে অতিরিক্ত এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের জন্য ইতোমধ্যে নয়টি কার্গোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের প্রয়োজন মেটাতে আরও প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি কার্গো প্রয়োজন হতে পারে। অক্টোবরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় চারটি কার্গো পাওয়ার প্রত্যাশা করছে পেট্রোবাংলা।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গানভরকে দুটি কার্গো সরবরাহের জন্য বলা হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী ২০২৮ সাল পর্যন্ত জেকেএম সূচক অনুসারে মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি প্রতি ইউনিট এলএনজির জন্য নির্দিষ্ট অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার কথা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

স্পট বাজারে কেন বাড়তি দাম

সাম্প্রতিক তিনটি কার্গোর দর বিশ্লেষণ করলেই বাড়তি ব্যয়ের চিত্র স্পষ্ট হয়। ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর প্রতি ইউনিট এলএনজির দর দেয় ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার। অথচ ওই সময় জেকেএম মূল্য ছিল সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ০৯ ডলার। ফলে একটি কার্গোতেই প্রায় ৯০ লাখ ডলারের বেশি অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ পড়ে।

অন্যদিকে, ১-২ অক্টোবর সরবরাহের জন্য বিপি সিঙ্গাপুরের দর ছিল প্রতি ইউনিট ২৮ দশমিক ০৩ ডলার। তখন জেকেএম মূল্য ছিল প্রায় ২৫ ডলার। এই কার্গোতেও প্রায় ৯০ লাখ ডলার বাড়তি ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেছে।

৫-৬ অক্টোবর সরবরাহের জন্য বিটল ইশয়া লিমিটেডের দর ছিল প্রতি ইউনিট ২৬ দশমিক ৬৬৮৮ ডলার। ওই সময়ে জেকেএম মূল্য ছিল প্রায় ২৫ ডলার। অর্থাৎ এই কার্গোতেও সূচক মূল্যের তুলনায় বেশি অর্থ দিতে হয়েছে।

আরপিজিসিএলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে তিনটি কার্গোর জন্য টেন্ডার আহ্বানের সময় প্ল্যাটস ও জেকেএমভিত্তিক মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট প্রায় ২২ দশমিক ৮২ থেকে ২৪ দশমিক ৬১ ডলারের মধ্যে। কিন্তু টেন্ডারে পাওয়া সর্বনিম্ন দরগুলো ছিল এর চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে কম দামের নজির

স্পট বাজারের বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে কিছুটা কম দামে এলএনজি সংগ্রহের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ১০-১১ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য সৌদি আরবের আরামকোর কাছ থেকে একটি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। এ কার্গোর দর ছিল প্রতি ইউনিট ২৩ দশমিক ৯৮ ডলার। একই সময়ে জেকেএম মূল্য ছিল ২৪ দশমিক ০৭৬ ডলার।

অর্থাৎ ওই চুক্তিতে আন্তর্জাতিক সূচকের তুলনায় সামান্য কম দামে এলএনজি কেনা সম্ভব হয়েছে। এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই সরকার স্পট বাজারের পরিবর্তে সরাসরি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি করতে চাইছে।

ইতোমধ্যে জাপানের জেরা, দক্ষিণ কোরিয়ার পসকো, ইন্দোনেশিয়ার পারটামিনা এবং সৌদি আরামকোর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। জেকেএম সূচকের চেয়ে কম দামে স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি সরবরাহ করা হলে দ্রুত অর্থ পরিশোধসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানই আগামী তিন মাসে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহে সম্মতি দেয়নি।

সরবরাহের পাশাপাশি রয়েছে কারিগরি সীমাবদ্ধতা

এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দামই সমস্যা নয়। পেট্রোবাংলার কারিগরি কিছু সীমাবদ্ধতাও সরবরাহকারী নির্বাচনকে কঠিন করে তুলছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা এলএনজির গড় তাপমান সাধারণত প্রতি মানঘনফুটে প্রায় ১ হাজার ৯০ থেকে ১ হাজার ১১৮ বিটিইউ। কিন্তু আমদানি করা এলএনজিকে দেশের নিজস্ব উৎপাদিত গ্যাসের সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে মিশিয়ে সরবরাহ করতে হয়। এ কারণে বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তাপমান ও গ্যাসের গুণগত বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে হয়।

পেট্রোবাংলার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ ধরনের কারিগরি শর্তের কারণে কিছু আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী বাংলাদেশে এলএনজি দিতে আগ্রহী হয় না। ফলে প্রতিযোগী দরদাতার সংখ্যা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই টেন্ডারে প্রতিযোগিতার সুযোগও সীমিত হয়।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো সময়ের স্বল্পতা। স্পট বাজারে অনেক সময় খুব অল্প সময়ের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করে দ্রুত কার্গো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হয়। ফলে দূরবর্তী সরবরাহকারী, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কোম্পানি আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় সময়ের মধ্যে কার্গো প্রস্তুত করে সরবরাহ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

সরকারের নতুন কৌশল

স্পট বাজারে বাড়তি দামে এলএনজি কেনার বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি বিভাগ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানির ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।

মূল লক্ষ্য হচ্ছে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি না হতে দেওয়া। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে এলএনজি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা প্রয়োজন।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধজনিত অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে এলএনজির দাম কোন দিকে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। ফলে একদিকে দ্রুত প্রয়োজনীয় কার্গো সংগ্রহ, অন্যদিকে তুলনামূলক কম দামে আমদানি—দুই লক্ষ্য একসঙ্গে পূরণ করাই এখন পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | সাব-এডিটর । জিলাইভ বাংলা

https://glive24.com/

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।