বিমানের এমডি শফিকুরের ঘরে শিশুর প্রতি নরকীয় আচরণ

জীবিকার তাগিদে মাত্র ১১ বছর বয়সে বিত্তবান ব্যক্তির বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানো শিশু ময়নাকে (ছদ্মনাম) এক অবর্ণনীয় নরকের মুখোমুখি হতে হলো। আশা ছিল সামান্যই — কিছু খাবার, নিরাপদ আশ্রয় এবং নিরাপদ জীবন। কিন্তু সেই আশা বদলে গেছে ভীতিকর বাস্তবতায়। তার ছোট্ট শরীরজুড়ে চোখ রাঙানো ক্ষতচিহ্ন এবং অমানবিক নির্যাতনের চিহ্ন দেখে যে কেউ হতবাক হয়ে যেতে পারে।

পুলিশ জানায়, শিশু ময়নাকে খুন্তি গরম করে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়, যার ফলে তার হাত ও পায়ের হাড় ফেটে যায়। গলা, হাত ও পায়ের বিভিন্ন স্থানে কালচে দাগ দেখা গেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি জানিয়েছে, ২ নভেম্বরের পর থেকে তার ওপর ধারাবাহিকভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রোববার রাতেই উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রভাবশালী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী বিথীকে গ্রেফতার করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই রোমের মিয়া আদালতে তাদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।

অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন বলেন, শফিকুর রহমান সরকারি কর্মকর্তা, তিনি অধিকাংশ সময় সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকেন। তিনি ও তার স্ত্রী কোনোভাবে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তবে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে জামিনের তীব্র বিরোধিতা করা হয়। প্রসিকিউশন এসআই তাহমিনা আক্তার বলেন, ১১ বছরের শিশুটিকে পেটের দায়ে পরিবারের অনুমতিতে কাজে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই তাকে নিয়মিত নির্যাতন করা হয়।

শিশুটির বাবা, হোটেল কর্মচারী গোলাম মোস্তফা, মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, গত বছরের জুনে ময়নাকে গৃহকর্তৃপক্ষের বাসায় কাজের জন্য দেওয়া হয়। শর্ত ছিল, মেয়ের সব খরচ ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব গৃহকর্তৃপক্ষ নেবে। কিন্তু ২ নভেম্বরের পর তাকে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। পরে ৩১ জানুয়ারি শিশুটি অসুস্থ হয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে আসার সময় তার গুরুতর জখম অবস্থা দেখা যায়।

মূল তথ্যসংগ্রহ (সংক্ষেপে)

বিষয়বিবরণ
শিশু বয়স১১ বছর
নির্যাতনের ধরনখুন্তি গরম করে ছ্যাঁকা, ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত, হাত-পায়ে হাড় ভাঙা, শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালচে দাগ
চিকিৎসা কেন্দ্রগাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
গ্রেফতারকৃতশফিকুর রহমান (বিমান বাংলাদেশ এমডি) ও স্ত্রী বিথী
গ্রেফতারের স্থানউত্তরার ৯ নম্বর সেক্টর
মামলার তদন্ত কর্মকর্তাউত্তরা পশ্চিম থানার এসআই রোমের মিয়া
আদালতের সিদ্ধান্তজামিন নামঞ্জুর, কারাগারে প্রেরণ

এই ঘটনায় আসামিদের আদালতে তোলা হলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজু আহমেদ জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বিষয়টি প্রমাণ করে, শিশুর নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। ছোট্ট ময়নার এই কষ্টের ঘটনা সমাজের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা, যেখানে ধনাঢ্য পরিবারেও শিশুদের প্রতি দায়িত্বহীনতা কত ভয়ংকর রূপ নিতে পারে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।