বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে বিপ্লবী রবি নিয়োগী এক অনন্য নাম। তাঁর জীবন ছিল ত্যাগ, সংগ্রাম ও আদর্শের এক দীপ্ত প্রতিচ্ছবি। জমিদারি পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি সাধারণ মানুষের মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছিলেন।
১৯০৯ সালের ২৯ এপ্রিল বৃহত্তর ময়মনসিংহের শেরপুর জেলার গৃদানারায়ণপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা রমেশ চন্দ্র নিয়োগী এবং মাতা সুরবালা নিয়োগী উভয়েই তৎকালীন কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পারিবারিক রাজনৈতিক পরিবেশই শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে সমাজচেতনা ও রাজনৈতিক বোধের ভিত্তি গড়ে তোলে।
শিক্ষাজীবনে তিনি ১৯২৬ সালে শেরপুর গোবিন্দ কুমার পিস মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি আনন্দ মোহন কলেজে ভর্তি হন। তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে সেখান থেকে বহিষ্কৃত হন এবং পরে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন। এই সময়েই তাঁর সঙ্গে বিপ্লবী যুগান্তর দলের পরিচয় ঘটে, যা তাঁর জীবনের মোড় সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে দেয়।
১৯৩০ সাল ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। কংগ্রেসের সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তিনি প্রথমবার গ্রেপ্তার হন। একই বছর চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল আন্দোলনের পর ময়মনসিংহ অঞ্চলে যুগান্তর দলের সংগঠনে তাঁর ভূমিকার কারণে তিনি আবারও গ্রেপ্তার হন।
১৯৩১ সালে সালদা জমিদার বাড়িতে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় তাঁকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রথমে তাঁকে রাজশাহী কারাগারে রাখা হয় এবং পরে “বিপজ্জনক বন্দি” হিসেবে আন্দামানের সেলুলার জেলে পাঠানো হয়। সেখানে কঠোর নির্যাতনের মধ্যেও তিনি নিজের আদর্শ ও রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হননি।
মুক্তির পর তাঁর রাজনৈতিক জীবন নতুন মোড় নেয়। নিচের সময়রেখায় তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বছর | ঘটনা |
|---|---|
| ১৯৩৭ | কারামুক্তি ও রাজনৈতিক পুনঃসক্রিয়তা |
| ১৯৩৭ | ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান |
| ১৯৪৩ | নলিতাবাড়ীতে কৃষক সম্মেলনের নেতৃত্ব |
| ১৯৪৫ | নেত্রকোনায় সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলনের আয়োজন |
| ১৯৪৭ পরবর্তী | পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট আন্দোলনে নেতৃত্ব |
| স্বাধীনতার পর | বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত থেকে সংগ্রাম |
| ২০০২ | ১০ মে শেরপুরে মৃত্যু |
কারামুক্তির পর তিনি কৃষক ও শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৪৩ সালে নলিতাবাড়ীতে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলন এবং ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনায় অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় তিনি কৃষক সংগঠনের ভিত্তি মজবুত করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
দেশভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয় থাকেন এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
দীর্ঘ সংগ্রামমুখর জীবনের অবসান ঘটে ২০০২ সালের ১০ মে, শেরপুরেই। তাঁর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আদর্শের প্রতি অটল নিষ্ঠা, সাহস এবং আত্মত্যাগ ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকে। বিপ্লবী রবি নিয়োগী তাই বাঙালির সংগ্রামী ইতিহাসে এক অমর নাম হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন।
