,

বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ক্যাপাসিটি চার্জ: প্রচার বনাম বাস্তবতা

আমরা যখন বাজার থেকে চাল, ডাল, জামাকাপড় কিংবা কোনো আসবাবপত্র কিনি, তখন হিসাবটা খুবই সাধারণ—যতটুকু নিলাম, ততটুকুর দাম মেটালাম। পণ্যটি বানিয়ে প্রস্তুতকারী যদি গুদামে জমিয়েও রাখে, তাহলেও ক্রেতার কোনো দায় থাকে না। কিন্তু আমাদের জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বা পাওয়ার গ্রিড কিন্তু এইভাবে কাজ করতে পারে না। বিদ্যুৎ কোনো বস্তুর মতো পাত্রে ভরে বা গুদামে জমিয়ে রাখা যায় না। ব্যাটারি প্রযুক্তিতে দিনে দিনে অনেক অগ্রগতি হলেও, জাতীয় গ্রিডের বিশাল স্কেলে বিদ্যুৎ যে মুহূর্তে উৎপাদিত হয়, ঠিক সেই মুহূর্তেই তা ব্যবহারের জায়গায় পৌঁছে যেতে হয়।

উৎপাদন আর ব্যবহারের এই অতি-সংবেদনশীল সমন্বয়ের কারণেই বিদ্যুৎ খাতের অর্থনৈতিক নিয়মাবলি আমাদের প্রতিদিনের কেনাকাটার চেয়ে একেবারে আলাদা। একটি দেশে সার্বক্ষণিক আলো জ্বালাতে হলে, মিল-কারখানা সচল রাখতে হলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে প্রতি সেকেন্ডে প্রস্তুত রাখতে হয়। আর এই প্রস্তুতি ধরে রাখার যে নির্দিষ্ট ও অনিবার্য খরচ, তা মেটানোর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পদ্ধতির নামই হলো ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ (Capacity Charge)।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই একটি কথা বেশ জোরেশোরে বলা হয়— বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রেখে নাকি মালিকদের ‘বসিয়ে বসিয়ে’ হাজার হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। কথাটি শুনতে চমকপ্রদ হলেও, অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতায় এটি কতটা সত্য আর কতটুকু সস্তা রাজনৈতিক বিভ্রান্তি—তা বুঝতে হলে বিদ্যুতের বাজার, ব্যাংক ঋণ এবং পাওয়ার প্রজেক্টের পেছনের অর্থনীতিকে গভীরভাবে দেখতে হবে।

 

বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি ও দ্বিমুখী ট্যারিফ ব্যবস্থা

আন্তর্জাতিক বিদ্যুৎ অর্থনীতিতে রাষ্ট্র বা সরকারি সংস্থা যখন কোনো বেসরকারি বা স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকের (Independent Power Producer – IPP) কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন দুই পক্ষের মধ্যে একটি আইনি চুক্তি সই হয়। একে বলা হয় ‘পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট’ বা পিপিএ (PPA)।

এই পিপিএ চুক্তির মূল ভিত্তিই হলো ‘টু-পার্ট ট্যারিফ’ বা দ্বিমুখী মূল্য কাঠামো। এর মানে হলো, বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আসা বিলকে দুটো আলাদা ভাগে ভাগ করে হিসাব করা হয়।

১. ক্যাপাসিটি চার্জ (স্থির ব্যয়)

বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু থাকুক বা বন্ধ থাকুক, এটি যদি জাতীয় গ্রিডের আদেশ পাওয়া মাত্রই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রস্তুত থাকে, তবে চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী উৎপাদককে এই নির্দিষ্ট চার্জ মেটাতে হয়। সহজ কথায়, এটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থির বা স্থায়ী খরচ (Fixed Cost)।

২. এনার্জি চার্জ (পরিবর্তনশীল ব্যয়)

বিদ্যুৎ কেন্দ্র যখন বাস্তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে শুরু করে, তখন যে পরিমাণ জ্বালানি (কয়লা, গ্যাস, ফার্নেস অয়েল কিংবা ডিজেল) পোড়ানো হয়, তার খরচ মেটাতে এই চার্জ দেওয়া হয়। এটিকে বলা হয় পরিবর্তনশীল খরচ (Variable Cost)। যদি জাতীয় গ্রিডে চাহিদা না থাকার কারণে একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরো মাস বন্ধ রাখা হয়, তবে রাষ্ট্রকে ‘এনার্জি চার্জ’ বাবদ এক টাকাও দিতে হয় না।

বিষয়টি একটি অতি-পরিচিত বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে খুব সহজে বোঝা যেতে পারে। ধরুন, আপনি এক মাসের জন্য একটি গাড়ি ভাড়া করলেন এই শর্তে যে, গাড়ি এবং ড্রাইভার ২৪ ঘণ্টা আপনার দরজায় প্রস্তুত থাকবে। আপনি প্রতিদিন গাড়ি নিয়ে ৩০০ কিলোমিটার ঘুরে বেড়ান, কিংবা পুরো মাস গ্যারেজে দাঁড় করিয়ে রাখেন—গাড়ির মালিককে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত মাসিক ভাড়া কিন্তু ঠিকই দিতে হবে। কারণ চালক তার সময় এবং গাড়ি আপনার জন্য আটকে রেখেছেন, অন্য কোথাও ভাড়া খাটাননি। এটিই হলো ক্যাপাসিটি চার্জ। আর গাড়িটি গ্যারেজ থেকে বের করে চালাতে যে লিটার লিটার পেট্রোল লাগবে, তা হলো এনার্জি চার্জ। আপনি যদি গাড়ি না চালান, আপনার পেট্রোলের টাকা বাঁচবে, কিন্তু গ্যারেজে দাঁড়িয়ে থাকলেও চুক্তির মাসিক ভাড়া মাফ হবে না।

সুতরাং, বিদ্যুতের মোট খরচের গাণিতিক হিসাবটি খুবই সহজ:

বিদ্যুতের মোট ব্যয় = ক্যাপাসিটি চার্জ (স্থির খরচ) + এনার্জি চার্জ (পরিবর্তনশীল জ্বালানি খরচ)

 

ক্যাপাসিটি চার্জের টাকা আসলে কোথায় যায়?

এক একটি বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল কাজ। একটি ৫০০ বা ১০০০ মেগাওয়াটের আধুনিক পাওয়ার প্ল্যান্ট গড়ে তুলতে কয়েক হাজার কোটি টাকা বা শত কোটি ডলারের প্রয়োজন হয়। কোনো কোম্পানির পক্ষে নিজেদের পকেটের টাকায় এত বিশাল কারখানা চালানো সম্ভব নয়। ফলে এই বাজেটের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ টাকাই আসে আন্তর্জাতিক বা দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে।

মালিকপক্ষ ক্যাপাসিটি চার্জের নামে যে টাকাটা পায়, সেটা দিয়ে মূলত কী করা হয়? এটি চারটে নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় হয়:

১. ব্যাংক ঋণ ও সুদের কিস্তি

ক্যাপাসিটি চার্জের সিংহভাগ টাকাই সোজা চলে যায় ব্যাংকগুলোতে। প্ল্যান্ট বানানোর সময় নেওয়া কোটি কোটি ডলারের যে বৈদেশিক ও দেশীয় ঋণ রয়েছে, তার আসল ও সুদের কিস্তি মেটাতে এই অর্থ ব্যবহৃত হয়। প্ল্যান্টের চাকা ঘুরুক বা না ঘুরুক, ব্যাংক কিন্তু ঋণের কিস্তির দিন পার হতে দেয় না।

২. কর্মীদের বেতন ও স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ

বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও সেখানে কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান, সিকিউরিটি গার্ড এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়মিত বেতন মেটাতে হয়। তা ছাড়া বিশাল বিশাল টারবাইন, বয়লার ও সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি যাতে মরিচা ধরে বা নষ্ট হয়ে অব্যবহারযোগ্য না হয়ে যায়, সে জন্য নিয়মিত কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ চালিয়ে যেতে হয়।

৩. উদ্যোক্তাদের মূলধনের লভ্যাংশ (Return on Equity)

উদ্যোক্তারা নিজেদের বিপুল পরিমাণ অর্থ অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছেন। ব্যাংকের দেনা মেটানোর পর সেই বিনিয়োগকৃত মূলধনের ওপর একটি যৌক্তিক হারে লভ্যাংশ বা রিটার্ন নিশ্চিত করা হয়। এই রিটার্নের নিশ্চয়তা না থাকলে আন্তর্জাতিক কিংবা দেশীয় কোনো বিনিয়োগকারী হাজার কোটি টাকা ফেলে রেখে বিদ্যুৎ বানাতে আসবে না।

৪. আন্তর্জাতিক বীমা ও সংবিধিবদ্ধ ফি

যেকোনো মুহূর্তে আগুন লাগা, ভূমিকম্প, কিংবা বড় কোনো যান্ত্রিক দুর্ঘটনাজনিত ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে মেগা প্ল্যান্টগুলোর জন্য কোটি কোটি টাকার আন্তর্জাতিক বীমা (Insurance) কভার নিতে হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরকে নিয়ম অনুযায়ী বার্ষিক অ্যাপ্রুভাল ফি ও কর দিতে হয়।

 

ক্যাপাসিটি চার্জের গাণিতিক হিসাব কীভাবে করা হয়?

ক্যাপাসিটি চার্জ কিন্তু কোনো আনুমানিক বা যথেচ্ছ অঙ্কের টাকা নয়। এটি নির্ধারিত হয় আন্তর্জাতিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফিনান্সের একটি নিখুঁত গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে। আর এই সমীকরণের চাবিকাঠি হলো ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রাপ্যতা’ (Plant Availability Factor)।

প্ল্যান্ট প্রাপ্যতা বা অ্যাভেলেবিলিটি

পিপিএ চুক্তির সবচেয়ে কঠিন শর্ত হলো ‘প্রাপ্যতা’। কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র যদি বলে যে তারা তৈরি, কিন্তু জাতীয় লোড ডেসপ্যাচ সেন্টার থেকে অর্ডার দেওয়ার পর দেখা গেল তাদের যান্ত্রিক ত্রুটি রয়েছে বা প্ল্যান্ট চালু হচ্ছে না—তবে তারা প্রস্তুত ছিল বলে গণ্য হবে না। শুধুমাত্র তখনই একটি কেন্দ্র ক্যাপাসিটি চার্জ পাওয়ার দাবি করতে পারে, যখন তাদের সব যন্ত্রপাতি সম্পূর্ণ সচল এবং নির্দেশ পাওয়া মাত্রই গ্রিডে বিদ্যুৎ পাঠাতে প্রস্তুত থাকে।

ক্যাপাসিটি পেমেন্ট গণনার সমীকরণ

প্রতি মাসের কাজের দিন ও প্রস্তুত থাকার অনুপাত হিসাব করে এই পেমেন্ট তৈরি করা হয়:
ক্যাপাসিটি পেমেন্ট = চুক্তিকৃত ক্ষমতা (মেগাওয়াট) × নির্ধারিত মাসিক রেট (টাকা/মেগাওয়াট) × প্রকৃত প্রাপ্যতা সূচক
এখানে, প্রকৃত প্রাপ্যতা সূচক = (বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকৃত প্রস্তুত থাকা মোট সময় / মাসের মোট সময়) × ১০০।

 

বাস্তব তিনটি দৃশ্যের সহজ গাণিতিক বিশ্লেষণ

ধরে নেওয়া যাক, একটি ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে সরকারের একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে।
  • চুক্তিকৃত ক্ষমতা: ৪০০ মেগাওয়াট
  • প্রতি মেগাওয়াটের নির্ধারিত মাসিক ক্যাপাসিটি রেট: ৫০ লাখ টাকা
  • প্রতি মাসে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য ক্যাপাসিটি চার্জ: ৪০০ মেগাওয়াট × ৫০ লাখ টাকা = ২০ কোটি টাকা।

 

প্রথম দৃশ্যপট: বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রস্তুত ছিল এবং জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ নিয়েছে
বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুরো ৩০ দিনই (১০০% সময়) সচল ছিল এবং জাতীয় চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ তৈরি করেছে।

ফলাফল: প্ল্যান্টটি ১০০% প্রাপ্যতা দেখিয়েছে। ফলে সেটি চুক্তির পুরো ২০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পাবে। আর এর পাশাপাশি যত ইউনিট বিদ্যুৎ তৈরি করেছে, তার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের বা কয়লার পুরো দাম (‘এনার্জি চার্জ’) আলাদাভাবে হিসাব করে দেওয়া হবে।

 

দ্বিতীয় দৃশ্যপট: বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রস্তুত ছিল, কিন্তু জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ নেয়নি
শীতকাল চলে আসায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা একদম কমে গেছে। ফলে ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাচ সেন্টার এই ৪০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রকে বার্তা পাঠাল—”তোমাদের এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন করার দরকার নেই, তোমরা বন্ধ রাখো।” কিন্তু কেন্দ্রটি নিজের কারিগরি সক্ষমতা শতভাগ বজায় রেখে প্রস্তুত ছিল।

ফলাফল: যেহেতু প্ল্যান্টটি তার কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য তৈরি বসে ছিল, তাই চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী সেটি পুরো ২০ কোটি টাকাই ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পাবে। তবে যেহেতু প্ল্যান্টটি এক ইউনিট বিদ্যুৎও উৎপাদন করেনি এবং কোনো জ্বালানি পোড়ায়নি, তাই রাষ্ট্রকে এক টাকাও ‘এনার্জি চার্জ’ দিতে হবে না।

 

তৃতীয় দৃশ্যপট: বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিজস্ব যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ ছিল
মাসের ৩০ দিনের মধ্যে ১০ দিন কেন্দ্রটির নিজস্ব জেনারেটরে ক্রুটি ছিল, যার কারণে সেটি বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

ফলাফল: এই মাসে কেন্দ্রটি মাত্র ২০ দিন প্রস্তুত থাকতে পেরেছে। অর্থাৎ এর প্রকৃত প্রাপ্যতা ছিল ৬৬.৬৭%।

প্রাপ্য ক্যাপাসিটি চার্জ = ৪০০ মেগাওয়াট × ৫০ লাখ টাকা × ৬৬.৬৭% = ১৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা (প্রায়)।
নিজের যান্ত্রিক ব্যর্থতার জন্য কেন্দ্রটি প্রায় ৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা জরিমানা গুনল এবং ওই টাকা হারাল।

 

স্থির খরচ ও পরিবর্তনশীল খরচের স্পষ্ট পার্থক্য

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালন ব্যয়কে যদি আমরা দুই ভাগে ভাগ করি, তবে বিষয়টির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

স্থির খরচ (ক্যাপাসিটি চার্জের আওতাভুক্ত)

  • ব্যাংক ঋণের মূলধন ও সুদের কিস্তি পরিশোধ।
  • প্রকৌশলী ও কর্মচারীদের স্থায়ী বেতন এবং ক্যাম্প পরিচালনা খরচ।
  • আন্তর্জাতিক বীমা প্রিমিয়াম এবং সংবিধিবদ্ধ লাইসেন্সিং ফি।
  • প্ল্যান্ট অলস থাকলেও তার ক্ষয়ক্ষতি রোদে নিয়মিত মেইনটেন্যান্স খরচ।
  • মূলধন বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট লভ্যাংশ বা রিটার্ন।

পরিবর্তনশীল খরচ (এনার্জি চার্জের আওতাভুক্ত)

  • ব্যবহৃত জ্বালানির দাম (কয়লা, গ্যাস, ফার্নেস অয়েল, কিংবা ইউরেনিয়াম)।
  • ওয়াটার ট্রিটমেন্ট, কেমিক্যাল এবং ইঞ্জিন অয়েল বা লুব্রিকেন্টের খরচ।
  • বর্জ্য বা ছাই অপসারণ এবং পরিবেশগত ক্লিয়ারেন্স খরচ।
  • একটি বন্ধ প্ল্যান্ট চালু করার সময় প্রথম কয়েক ঘণ্টার অতিরিক্ত স্টার্ট-আপ জ্বালানি খরচ।

 

ক্যাপাসিটি চার্জ কেন না দিয়ে উপায় নেই?

কারো মনে এই মৌলিক প্রশ্নটি আসা খুব স্বাভাবিক— সরকার কেন কেবল উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি দাম মেটায় না? যতটুকু বিদ্যুৎ নেওয়া হবে, কেবল ততটুকু বিদ্যুতের বিল দিলেই তো সব ঝামেলা চুকে যায়!

বাস্তবতার নিরিখে এই চিন্তাটা আকর্ষণীয় মনে হলেও বিদ্যুৎ অর্থনীতিতে এটি পুরোপুরি অসম্ভব। এর পেছনের কারণগুলো নিচে স্পষ্ট করা হলো:

১. বিশাল মূলধনী ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া

একটি কাপড় বা জুতার কারখানা যখন বিক্রি কমে যায়, তারা উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে বা কর্মী ছাঁটাই করতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হাজার হাজার কোটি টাকা শুরুতেই খরচ হয়ে যায়। যদি কোনো বিনিয়োগকারীকে বলা হয়— “বিদ্যুৎ কিনলে টাকা দেব, না কিনলে এক টাকাও পাবে না”, তবে সরকার হঠাৎ বিদ্যুৎ না কিনলে সে দেউলিয়া হয়ে যাবে। এই চরম অনিশ্চয়তার মুখে বিশ্বের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ খাতে এক পয়সাও বিনিয়োগ করবে না।

২. ব্যাংক ঋণের কঠিন শর্ত

পাওয়ার প্রজেক্টে যে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়, তারা ‘প্রজেক্ট ফাইন্যান্সিং’ নিয়মে কাজ করে। ব্যাংকগুলোর প্রধান শর্তই থাকে যে, প্রকল্পটি থেকে ঋণের কিস্তি শোধ করার মতো নিশ্চিত আয়ের ব্যবস্থা (Debt Service Coverage Ratio) চুক্তিতে থাকতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্জের যে আইনি নিশ্চয়তা আইপিপি চুক্তিতে থাকে, তা দেখেই কেবল ব্যাংকগুলো হাজার হাজার কোটি টাকার লোন ছাড় করে। এটি না থাকলে অর্থায়নই থমকে যাবে।

৩. পিক চাহিদা এবং নিরাপত্তা রিজার্ভ মার্জিন

একটি দেশের বিদ্যুতের চাহিদা বছরের সব দিনে বা দিনের সব সময়ে এক থাকে না।

যেমন: একটি গরমের দেশে শীতকালের রাতে যেখানে বিদ্যুতের চাহিদা হয়তো ৮,০০০ মেগাওয়াট, গ্রীষ্মকালের তীব্র খরতাপে এসি ও সেচপাম্প চলার কারণে সেই চাহিদাই লাফিয়ে হয়ে যায় ১৬,০০০ মেগাওয়াট।

এখন গরমকালের এই অতিরিক্ত ৮,০০০ মেগাওয়াট চাহিদা পূরণ করতে হলে সরকারকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র তো বানিয়ে রাখতেই হবে। শীতকালের চার-পাঁচ মাস হয়তো এই কেন্দ্রগুলো অলস বসে থাকবে। কিন্তু যদি ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া না হতো, তবে আয় না পেয়ে এই ব্যাকআপ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো দেউলিয়া হয়ে পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যেত। আর তারপর গ্রীষ্মকাল আসামাত্র পুরো দেশ ডুবে যেত ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে। গ্রিড সচল রাখতে অতিরিক্ত পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রস্তুত রাখার খরচ ক্যাপাসিটি চার্জেরই অংশ।

 

ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়া কি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চলতে পারে?

ইউরোপ বা আমেরিকার কিছু উন্নত দেশে ক্যাপাসিটি চার্জের বদলে বিকল্প কিছু বাজার ব্যবস্থা চালু আছে। তবে সেসব ব্যবস্থার নিজস্ব ভয়ংকর ঝুঁকি ও জটিলতা রয়েছে।

এনার্জি-অনলি মার্কেট বা মুক্ত স্পট মার্কেট

এই মডেলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে সরকার কোনো ফিক্সড ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ দেয় না। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো কেবল বিদ্যুতের ইউনিট বিক্রি করে টাকা উপার্জন করে।

তবে এর পেছনের নিয়মটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে বিদ্যুতের দাম প্রতি ঘণ্টায় চাহিদা ও জোগানের ওপর ভিত্তি করে মেটানো হয়। স্বাভাবিক সময়ে বিদ্যুতের দাম কম থাকলেও, যখন প্রচণ্ড গরমে বা শীতের ঝড়ে বিদ্যুতের তীব্র অভাব দেখা দেয়, তখন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো তাদের বিদ্যুতের দাম ৫০ থেকে ২০০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। এই চরম চড়া দামের মাধ্যমে তারা সারা বছরের স্থির খরচ মাত্র এক সপ্তাহে বের করে নেয়।

এই মডেলের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো আমেরিকার টেক্সাস অঙ্গরাজ্য। ২০২১ সালের শীতকালীন তুষারঝড়ে যখন টেক্সাসে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়, তখন সাধারণ গ্রাহকদের একেকজনের এক সপ্তাহের বিদ্যুতের বিল এসেছিল কয়েক হাজার ডলার (কয়েক লাখ টাকা)। অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছিল।

তা ছাড়া স্থায়ী আয় না থাকার ঝুঁকিতে অনেক সময় নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হতে চায় না, যাকে অর্থনীতিতে বলা হয় ‘মিসিং মানি প্রবলেম’ (Missing Money Problem)।

উন্নয়নশীল দেশের সীমাবদ্ধতা

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক স্পট মার্কেট চালুর মতো শক্তিশালী আর্থিক বাজার বা সমান্তরাল সঞ্চালন ব্যবস্থা থাকে না। এখানে রাষ্ট্র একাই বিদ্যুতের মূল ক্রেতা। ফলে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি পুঁজি টানতে এবং সার্বক্ষণিক নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্বিমুখী ট্যারিফ ও ক্যাপাসিটি চার্জের বিকল্প নেই।

 

বাংলাদেশে ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে অপপ্রচার বনাম আসল সমস্যা

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে যে বিপুল আলোচনা ও সমালোচনা দেখা যায়, তার পেছনের সত্যটি আবেগ বাদ দিয়ে বোঝা দরকার।

 

কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সংকটের ইতিহাস

২০০৯ সালের দিকে বাংলাদেশে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হতো। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা—সব জায়গায় হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদি বড় কয়লা বা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানাতে অন্তত ৫ থেকে ৮ বছর সময় লাগে। সেই মুহূর্তে জরুরিভিত্তিতে দেশের অর্থনীতিকে সচল করতে সরকার ৩ থেকে ৫ বছর মেয়াদি ‘কুইক রেন্টাল’ ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলচালিত পাওয়ার প্ল্যান্টের চুক্তি করতে বাধ্য হয়।

তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসাতে আসার কারণে বিনিয়োগকারীদের পিপিএ চুক্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জের আইনি গ্যারান্টি না দিলে কোন বিনিয়োগকারীই আসতো না। এটি ছিল ওই সময়ের সংকটের দ্রুত সমাধান।

 

‘বসিয়ে বসিয়ে টাকা দেওয়া’ কথাটির প্রকৃত সত্য

রাজনীতিবিদ বা সমালোচকরা যখন বলেন, “বিদ্যুৎ না নিয়ে বসিয়ে বসিয়ে শত শত কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে”—তখন একটি অর্ধসত্যকে তুলে ধরা হয়।

আইনগত ও অর্থনৈতিকভাবে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র যদি তৈরি থাকে, তবে রাষ্ট্র তাকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে বাধ্য। রাষ্ট্র যদি নিজ থেকে বিদ্যুৎ গ্রহণ না করে বা জ্বালানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়ে কেন্দ্র বন্ধ রাখে, তবে চুক্তি অনুযায়ী সেটির স্থির ব্যয় মেটাতেই হবে। এটি প্ল্যান্টের মালিককে দেওয়া কোনো করুণা বা অবৈধ সুবিধা নয়; এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যাংক ঋণ শোধের আইনি অধিকার।

যদি সরকার জোড়জবস্তি করে এই টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তবে বিনিয়োগকারীরা সিঙ্গাপুর বা লন্ডনের আন্তর্জাতিক আর্বিট্রেশন আদালতে মামলা করবে। এতে রাষ্ট্রকে সুদে-আসলে কয়েক গুণ বেশি জরিমানা দিতে হবে এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে দেশের ক্রেডিট রেটিং ধসে পড়বে, যার ফলে পরবর্তীতে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশে এক ডলারও বিনিয়োগ করবে না।

 

মূল সমস্যা ক্যাপাসিটি চার্জ নয়, সমস্যা ওভারক্যাপাসিটি

ক্যাপাসিটি চার্জের নিয়মটি নিজে কোনো সমস্যা নয়। মূল গলদ তৈরি হয় তখন, যখন বিদ্যুতের প্রাক্কলিত চাহিদা (Demand Forecasting) এবং প্রকৃত চাহিদার মধ্যে বিশাল ব্যবধান দেখা দেয়।

ধরা যাক, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুতের সম্ভাব্য চাহিদা ১৬,০০০ মেগাওয়াট। নিরাপত্তার জন্য এবং ব্যাকআপের জন্য ২০,০০০ মেগাওয়াটের উৎপাদন সক্ষমতা থাকা যুক্তিসঙ্গত (২০-২৫% রিজার্ভ মার্জিন)। কিন্তু সরকারের শিল্প প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, বৈশ্বিক মন্দা কিংবা অন্য কোনো কারণে যদি দেশের কারখানা সেভাবে না বাড়ে এবং প্রকৃত চাহিদা ১৬,০০০ মেগাওয়াটেই আটকে থাকে—অথচ প্ল্যান্ট বানিয়ে ফেলা হয় ২৭,০০০ মেগাওয়াটের; তবে উদ্বৃত্ত ১১,০০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে পুরো বছর অলস বসে থাকতে হবে।

এই অলস বসে থাকা অতিরিক্ত ১১,০০০ মেগাওয়াটের জন্য রাষ্ট্রকে যে বিশাল ক্যাপাসিটি চার্জ মেটাতে হয়, তা জাতীয় বাজেটের ওপর বড় চাপ তৈরি করে। এটি মূলত নীতি-নির্ধারণী জায়গা এবং চাহিদা প্রাক্কলনের ভুল, ক্যাপাসিটি চার্জ প্রথার নিজস্ব কোনো অপরাধ নয়।

 

বড় মেগা প্রকল্প এবং ক্যাপাসিটি চার্জের পরিবর্তন

ইদানীংকালে বাংলাদেশে কিছু বড় বেসলোড (Base Load) পাওয়ার প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছে। যেমন— পায়রা ১২২০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল, মাতারবাড়ি এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

আগের ছোট ছোট ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল প্ল্যান্টের সাথে এই মেগা প্রজেক্টগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জের একটি বড় গুণগত তফাত রয়েছে:

  • পুরোনো ছোট তেলের প্ল্যান্টগুলোতে প্রারম্ভিক নির্মাণ খরচ কম হলেও সেগুলোর জ্বালানি খরচ ছিল অত্যন্ত চড়া। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেই প্রতি ইউনিটের দাম অনেক বেশি পড়ত।
  • নতুন মেগা প্রজেক্টগুলোতে প্রারম্ভিক অবকাঠামো নির্মাণ খরচ বা মূলধনী ব্যয় অনেক বেশি। তাই এদের ক্যাপাসিটি চার্জের হিসাবটা অংকে বড় মনে হয়। কিন্তু এদের আসল সুবিধা হলো— এদের জ্বালানি খরচ বা এনার্জি চার্জ অত্যন্ত কম।

একবার এই মেগা প্ল্যান্টগুলোর প্রারম্ভিক ব্যাংক ঋণ শোধ হয়ে গেলে, এগুলো আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে দেশকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারবে।

 

আমাদের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?

ক্যাপাসিটি চার্জ কোনো অবৈজ্ঞানিক বা ক্ষতিকারক প্রথা নয়; বরং এটি আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মূল অর্থনৈতিক ভিত। এটি না থাকলে দেশে কখনোই হাজার হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে উঠত না।

ক্যাপাসিটি চার্জকে রাজনৈতিক বিষোদ্গারের উপাদান না বানিয়ে, এর সঠিক অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা এবং সঠিক দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।