ইরানে অর্থনৈতিক সংকট থেকে জন্ম নেওয়া গণঅসন্তোষ এখন এক ভয়াবহ গণঅভ্যুত্থানের রূপ ধারণ করেছে। গত ২৮ ডিসেম্বর ব্যবসায়ীদের হাত ধরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন গতকাল শুক্রবার ১৩তম দিনে পদার্পণ করেছে। আন্দোলনের শুরুটা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে হলেও বর্তমানে তা সরাসরি বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ও সর্বোচ্চ নেতার পদত্যাগের দাবিতে মোড় নিয়েছে। চলমান এই সংঘাত দমনে সরকার কঠোর শক্তি প্রয়োগ করায় পরিস্থিতি এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) জানিয়েছে, গত ১৩ দিনের বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে আটজন শিশু রয়েছে। এছাড়া দেশজুড়ে ধরপাকড় অভিযানে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৭০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর আড়ালে রাখতে বৃহস্পতিবার রাত থেকে দেশজুড়ে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সরকার। পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘নেটব্লকস’ জানিয়েছে, এমনকি সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটকেও বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।
বিক্ষোভের বর্তমান চিত্র ও ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো:
ইরান বিক্ষোভ ২০২৬: বর্তমান পরিস্থিতির রূপরেখা
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| বিক্ষোভের মেয়াদ | টানা ১৩ দিন (শুক্রবার পর্যন্ত)। |
| প্রাণহানি | অন্তত ৪৫ জন (আইএইচআর কর্তৃক নিশ্চিত)। |
| গ্রেপ্তারকৃতের সংখ্যা | ২,২৭০ জন (মানবাধিকার সংস্থার হিসাব)। |
| আন্দোলনের বিস্তার | ইরানের ৩১টি প্রদেশের সব কয়টি অঞ্চল। |
| মূল কারণ | ৪০% মুদ্রাস্ফীতি, রিয়ালের দরপতন ও প্রশাসনিক দুর্নীতি। |
| ক্ষয়ক্ষতির ধরন | টেলিভিশন ভবন, মেট্রো স্টেশন ও ব্যাংকে অগ্নিসংযোগ। |
| আন্তর্জাতিক হুমকি | মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হামলার আলটিমেটাম। |
ট্রাম্পের হুমকি ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা
ইরানের অভ্যন্তরীণ এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপের পর ট্রাম্প এখন ইরানেও একই ধরণের অভিযানের হুমকি দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব কঠোরভাবে’ আঘাত হানবে। এই হুমকির প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক ভাষণে বলেছেন, বিক্ষোভকারীরা বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় কাজ করছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ইরানিদের রক্তে রঞ্জিত।
কেন উত্তাল ইরান?
দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের সরাসরি সংঘাত ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। বর্তমানে দেশটির মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এই অর্থনৈতিক ধসের পাশাপাশি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সীমাহীন দুর্নীতি ও বিলাসী জীবন যাপন সাধারণ ইরানিদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে।
আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি
বিক্ষোভকারীরা এখন কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ নেই; তারা ইসফাহান শহরে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘আইআরআইবি’ ভবনে আগুন দিয়েছে এবং বহু জায়গায় জাতীয় পতাকা ছিঁড়ে ফেলেছে। তেহরান ও বাবল শহরে নির্বাসিত শাহজাদা রেজা পাহলভির সমর্থনে স্লোগান উঠছে, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর বিরল এক দৃশ্য। নিরাপত্তার খাতিরে টার্কিশ এয়ারলাইনস ও কাতার এয়ারওয়েজসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তেহরানে তাদের ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
ইরানের এই বিক্ষোভ গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী গণআন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল শঙ্কা প্রকাশ করছে যে, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নের সুযোগে সরকার বড় ধরণের কোনো দমন-পীড়নের পথে হাঁটলে নিহতের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
