সাম্প্রদায়িকতার নীল নকশা: হুমকির মুখে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক অস্তিত্ব

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি তার জন্মের ইতিহাসেই অসাম্প্রদায়িকতা ও প্রগতিশীলতার বীজ বহন করে এসেছে। কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রের আচরণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ সত্য উন্মোচিত হয়। অসাম্প্রদায়িকতা এখন আর কেবল রাষ্ট্রীয় আদর্শ নয়, বরং সংবিধানের পাতায় বন্দি এক ম্লান স্মৃতিতে পরিণত হতে চলেছে। এক সুগভীর ও সুপরিকল্পিত নীল নকশার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে একটি উগ্র, ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হচ্ছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই রূপান্তরের পেছনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

যারা একসময় অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতেন, আজ তারাই ক্ষমতার সমীকরণ মেলাতে মৌলবাদী শক্তিকে মূলধারার রাজনীতিতে বৈধতা দেওয়ার পথ সুগম করছেন। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য এবং বিচারিক নীরবতা—সবকিছু মিলিয়ে একটি অন্ধকার বন্দোবস্তের দিকে দেশ ধাবিত হচ্ছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

ইতিহাস সাক্ষী, যখনই কোনো রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িক শক্তি জেঁকে বসেছে, তখনই প্রথম আঘাত এসেছে রাষ্ট্রের পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। প্রতিরক্ষা বাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আমলাতন্ত্র আজ আর আইন বা সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকছে না; বরং সেখানে আদর্শিক আনুগত্য যাচাই করা হচ্ছে। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, যারা ধর্মীয় উসকানি দিয়ে সমাজকে অস্থির করছে, তারা অনায়াসে পার পেয়ে যাচ্ছে। অথচ শিক্ষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং ভিন্নমতাবলম্বীরা সামান্য কারণেও অন্ধকার কারাগারে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করছেন। এই কাঠামোগত বৈষম্য একটি রাষ্ট্রের ভেঙে পড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।

মৌলবাদী রাজনীতির দর্শনে আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক উপাদানগুলো—যেমন সংসদ, সংবিধান এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব—ব্রাত্য হয়ে পড়ে। তাদের কল্পিত শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে এমন এক কর্তৃত্ববাদী আধারে, যেখানে নারী অধিকার খর্ব করা হয় এবং ভিন্নমতকে কঠোরভাবে দমন করা হয়। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সেখানে ‘পশ্চিমা ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিত্রিত হয়। এই পথে বাংলাদেশকে ঠেলে দেওয়া মানে দেশটিকে কয়েক শতাব্দী পেছনে নিয়ে যাওয়া, যেখানে বিজ্ঞানের বদলে অন্ধবিশ্বাস আর সহনশীলতার বদলে সহিংসতা শাসনের ভিত্তি হবে।

সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে আমাদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মুক্তচিন্তক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। ধর্মের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বৈধতা পাবে এবং প্রশ্ন করার অধিকারকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা হবে। আন্তর্জাতিক মহলেও এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। মৌলবাদী তকমা গায়ে লাগলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়বে, বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাজার সংকুচিত হবে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাও আজ বড় ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল একটি বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু উগ্রবাদের উত্থানের প্রশ্নে তাঁদের নির্লিপ্ততা অনেককেই শঙ্কিত করছে। ইতিহাস বলে, মৌলবাদের আস্ফালনে রাষ্ট্রের নীরবতা মূলত সেই অপশক্তিকে শক্তিশালী করারই নামান্তর। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এই স্বার্থপর রাজনৈতিক খেলায় রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বিসর্জন দেওয়া এক ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা। আজকের নাগরিক সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই পারে এই সংকট থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে। এখন নীরব থাকা মানেই এই ধ্বংসযজ্ঞে সহযোগিতা করা।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক
এবিএম জাকিরুল হক টিটন