রাজধানীর মধ্য বাড্ডার বেপারিপাড়া এলাকায় একটি সাধারণ আবাসিক বাড়িতে মিলল দুর্ধর্ষ এক অস্ত্রাগারের সন্ধান। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর এক বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী মেহেদী হাসান ওরফে দীপু। এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক ভয়ঙ্কর চিত্র। পুলিশি অভিযানে দীপুর নিজ ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১১টি অত্যাধুনিক বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ।
অভিযানের বিবরণ ও উদ্ধারকৃত সরঞ্জাম
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যৌথ বাহিনী বাড্ডার ওই বাড়িতে হানা দিলে বেরিয়ে আসে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের বিশাল মজুদ। উদ্ধারকৃত তালিকার মধ্যে রয়েছে একটি অত্যাধুনিক উজি (Uzi) মেশিনগান, যা সাধারণত বিশেষায়িত বাহিনী ব্যবহার করে। ডিএমপির বাড্ডা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার আসাদুজ্জামান নিশ্চিত করেছেন যে, গতকাল শুক্রবার দীপুকে গ্রেপ্তারের পর আজ শনিবার আদালত তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
নিচে উদ্ধারকৃত অস্ত্রের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হলো:
| সরঞ্জামের ধরন | পরিমাণ/বিবরণ |
| অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্র | ১১টি |
| বিভিন্ন প্রকার গুলি | ৩৯৪টি |
| উজি (Uzi) মেশিনগান রাইফেল | ০১টি |
| পিস্তল ম্যাগাজিন | ০৮টি |
| ওয়াকিটকি সেট | ০২টি |
| দেশীয় অস্ত্র (চায়নিজ কুড়াল ও চাকু) | ০৪টি |
| ল্যাপটপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম | ০১টি |
অপরাধজগতের ‘সেতু’ ও সুব্রত বাইন কানেকশন
মেহেদী হাসান দীপু নিছক কোনো সাধারণ অপরাধী নন; তিনি নব্বইয়ের দশকের কুখ্যাত ডন সুব্রত বাইনের ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত। বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, গুলশান ও বারিধারা এলাকার অপরাধ সাম্রাজ্য এখন দীপুর নিয়ন্ত্রণেই ছিল। গোয়েন্দা তথ্য মতে, গত বছরের মে মাসে কুষ্টিয়ায় সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের হয়ে মাঠ পর্যায়ের চাঁদাবাজি ও আধিপত্য রক্ষার দায়িত্ব নেন দীপু।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সুব্রত বাইন প্রতিবেশী দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র সংগ্রহ করেন। এই অস্ত্রগুলো দীপু এবং আরেক সহযোগী গোলাম মর্তুজা বাবু ওরফে মধু বাবুর কাছে জমা রাখা হয়। কেবল গত এক বছরেই এই চক্রটি বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে, যার মধ্যে গুলশানের ইন্টারনেট ব্যবসায়ী সুমন এবং নয়াটোলার যুবদল নেতা আরিফ সিকদার হত্যাকাণ্ড অন্যতম।
চাঁদাবাজি ও অস্ত্র ভাড়ার সাম্রাজ্য
দীপুর আয়ের প্রধান উৎস ছিল মেরুল বাড্ডার মাছের আড়ত, তৈরি পোশাক কারখানা এবং গাড়ির শোরুম থেকে নিয়মিত তোলা চাঁদাবাজি। বাড্ডা ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলমের সাথেও তাঁর সখ্যতার তথ্য পাওয়া গেছে। ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, দীপু কেবল নিজের স্বার্থেই অস্ত্র ব্যবহার করতেন না, বরং পেশাদার খুনিদের কাছে এবং বিভিন্ন স্থানীয় গ্যাংয়ের কাছে তিনি ‘অস্ত্র ভাড়া’ দিতেন।
এমনকি সুব্রত বাইন কারাগারে থাকলেও তাঁর মেয়ে খাদিজা ইয়াসমিনের মাধ্যমে দীপুর কাছে নিয়মিত বার্তা আসত। এই চক্রটি বাড্ডা ও ভাটারা এলাকাকে তাদের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলেছিল। দীপুর রিমান্ডে থাকা অবস্থায় পুলিশ আরও অন্তত ১৫-১৬টি অস্ত্রের সন্ধান পাওয়ার আশা করছে, যা তাঁর অন্যান্য সহযোগীদের কাছে লুকানো রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
