বগুড়া শহরের চকফরিদ এলাকায় নিজ ভাড়া বাসা থেকে সরকারি শাহ সুলতান কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক ফাবিয়া তাসনিম সিধির (২৯) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোক ও রহস্যের মেঘ। বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ যে অবস্থায় মরদেহটি উদ্ধার করে, তাতে তার মৃত্যু ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আতোয়ার রহমান শুক্রবার সকালে ঘটনাটি নিশ্চিত করে বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে এবং ময়নাতদন্তের পর প্রকৃত তথ্য জানা যাবে।
Table of Contents
কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবন
ফাবিয়া তাসনিম ৪১তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে দেড় বছর আগে সরকারি শাহ সুলতান কলেজের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি প্রাণিবিদ্যা বিভাগে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং সহকর্মীদের মতে অত্যন্ত কর্মঠ ও দায়িত্বশীল ছিলেন।
ময়মনসিংহের একটি সুশিক্ষিত পরিবার থেকে আসা ফাবিয়া অবিবাহিত ছিলেন। আর্থিক বা পারিবারিক কোনো সংকটের কথা কেউ জানাননি। বগুড়া শহরের চকফরিদ এলাকায় ডা. রাশেদুল হাসানের চারতলা ভবনের তৃতীয় তলায় তিনি তার মায়ের সঙ্গে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। কয়েক দিন আগে তার মা গ্রামের বাড়ি যাওয়ায় তিনি একাই ছিলেন।
ঘটনার সময় যা জানা যায়
বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে ফাবিয়ার ফোন বন্ধ বা অপ্রাপ্য থাকায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন তার মা। রাত ১০টার দিকে বগুড়ায় এসে বারবার ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি স্থানীয়দের সহযোগিতায় থানায় খবর দেন।
পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে। শৌচাগারের ভেতর পড়ে থাকা ফাবিয়ার নিথর দেহটি দেখে কর্মকর্তারা ধারণা করেন, কয়েক ঘণ্টা আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে—
তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিল,
মাথার পেছনে দৃশ্যমান আঘাতের দাগ ছিল,
যা স্বাভাবিক মৃত্যু বা আত্মহত্যার ধারণাকে জটিল করে তুলেছে।
পুলিশের তদন্তে অগ্রগতি
বগুড়া সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজ আলম জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়। একটি অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হলেও তদন্তে তারা তিনটি দিক বিবেচনায় রাখছেন—
১. অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা,
২. আত্মহত্যা,
৩. হত্যা।
তিনি বলেন, “ঘটনাস্থলে অগোছালো কিছু পাওয়া যায়নি। তবে মাথার চোট মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসাবাদ, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি বিশ্লেষণ—সবকিছু খতিয়ে দেখছি।”
স্থানীয়দের বক্তব্য
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ফাবিয়া খুবই শান্ত ও কম কথা বলতেন। কারও সঙ্গে বিরোধ কিংবা ঝামেলার বিষয় কখনো শোনা যায়নি। ঘরে কোনো জিনিসপত্র এলোমেলো ছিল না, যা তাদের মতে ঘটনাটিকে আরও সন্দেহজনক করে তোলে।
সামাজিক আলোড়ন
শিক্ষক, সহকর্মী এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ঘটনার পর নেমে এসেছে শোকের ছায়া। অনেকে সামাজিক মাধ্যমে লিখছেন, তরুণ এক মেধাবী শিক্ষকের এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। বাড়তি নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে নারীরা তাদের উদ্বেগও জানিয়েছেন।
পরিবারের অবস্থান
নিহতের মা ময়মনসিংহ থেকে এসে মেয়ে মৃত অবস্থায় দেখে ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, “আমার মেয়ে কখনো আত্মহত্যার কথা ভাবার মতো মানুষ ছিল না।” তিনি পুলিশের কাছে ন্যায়বিচার চান।
যদিও এখনো কোনো অভিযোগ আনেননি, তবে তিনি তদন্তে স্বচ্ছতা চান।
উপসংহার
ফাবিয়া তাসনিম সিধির মৃত্যু শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো শিক্ষাঙ্গনকে নাড়া দিয়েছে। মাত্র ২৯ বছর বয়সী এক শিক্ষকের এমন মৃত্যু তদন্তের গতি বাড়ানোর দাবি তুলছে অনেকেই। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, তদন্তের অগ্রগতি এবং পুলিশের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—সবকিছুই এখন জনমতের নজরে।
