ফ্লোরিডায় নিখোঁজ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বৃষ্টির দেহাবশেষ উদ্ধার ও শনাক্তকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পা বে এলাকায় নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন পর বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির খণ্ডিত দেহাবশেষ উদ্ধার করেছে স্থানীয় পুলিশ। সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সংলগ্ন জলাশয় থেকে এই দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। একই ঘটনার সূত্র ধরে এর আগে জামিল লিমন নামে আরও এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। পুলিশের তদন্তে এই জোড়া মৃত্যুর পেছনে পরিকল্পিত অপরাধের প্রমাণ মিলেছে।


নিখোঁজ ও প্রাথমিক উদ্ধার কার্যক্রম

নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ও জামিল লিমন উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ১৬ এপ্রিল থেকে তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর মার্কিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।

নিখোঁজ হওয়ার আট দিন পর, অর্থাৎ ২৪ এপ্রিল, টাম্পা বে এলাকার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের নিচ থেকে প্রথমে জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। লিমনের মরদেহ পাওয়ার পর বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশি অভিযান আরও জোরদার করে প্রশাসন।

দেহাবশেষ উদ্ধারের নাটকীয় প্রেক্ষাপট

নিখোঁজের দশম দিন অর্থাৎ ২৬ এপ্রিল নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির দেহাবশেষের সন্ধান মেলে। সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি ম্যানগ্রোভ বনের নিকটবর্তী জলাশয়ে দুইজন ব্যক্তি মাছ ধরছিলেন। মাছ ধরা চলাকালীন তারা পানিতে ভাসমান একটি বড় ব্যাগ বা পোটলা আটকে থাকতে দেখেন। ব্যাগটির কাছে পৌঁছালে সেখান থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে, যা তাদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করে।

সন্দেহবশত তারা ব্যাগটি পরীক্ষা করলে ভেতরে মানবদেহের খণ্ডিত দেহাংশ দেখতে পান। প্রত্যক্ষদর্শীরা তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় জরুরি সেবা নম্বরে কল করে পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন। দ্রুততম সময়ে গোয়েন্দা সংস্থা এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেহাবশেষগুলো উদ্ধার করেন। উল্লেখ্য, এই স্থানটি জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না।


বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া

উদ্ধারকৃত দেহাবশেষগুলো পচে যাওয়ায় এবং খণ্ডিত অবস্থায় থাকায় সাধারণ পর্যবেক্ষণে পরিচয় নিশ্চিত করা পুলিশের জন্য ছিল দুরূহ। তবে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে এটি বৃষ্টির দেহাবশেষ বলে নিশ্চিত করেন:

  • ডিএনএ বিশ্লেষণ (DNA Analysis): উদ্ধারকৃত দেহাংশ থেকে সংগৃহীত ডিএনএ নমুনার সঙ্গে নিখোঁজ বৃষ্টির ডিএনএ প্রোফাইলের শতভাগ মিল পাওয়া যায়। পরিচয় শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে এটিই ছিল সবচেয়ে জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।

  • দন্ত্য ফরেনসিক (Dental Records): বৃষ্টির পূর্বের দাঁতের চিকিৎসার তথ্য এবং এক্স-রে রেকর্ডের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের দাঁতের গঠন পরীক্ষা করা হয়। ফরেনসিক দন্ত বিশেষজ্ঞরা উভয় রেকর্ডের মধ্যে অভিন্নতা খুঁজে পান।

  • পোশাক ও ব্যক্তিগত নিদর্শন: নিখোঁজ হওয়ার দিন বৃষ্টি যে পোশাক পরেছিলেন, উদ্ধারকৃত দেহাংশের সঙ্গে থাকা কাপড়ের অবশিষ্টাংশের রঙ ও ধরন সেটির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।


তদন্ত ও প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার

তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশ জামিল লিমনের সাবেক রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তকারীরা হিশামের বাসভবনে তল্লাশি চালিয়ে মেঝের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা যায়, ওই রক্তের ডিএনএ-র সঙ্গে বৃষ্টির ডিএনএ নমুনার পূর্ণ মিল রয়েছে। এই অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, হত্যাকাণ্ডটি হিশামের বাসাতেই সংঘটিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে আলামত গোপনের উদ্দেশ্যে দেহাবশেষ জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিবারের প্রতিক্রিয়া

ফ্লোরিডা পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে বৃষ্টির পরিবারকে এই দুঃসংবাদটি অবহিত করেছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা কর্তৃপক্ষ তাদের দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন অকাল ও নৃশংস মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাদের স্মরণে একটি বিশেষ শোকসভার আয়োজন করা হয়। এছাড়াও তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে বিশেষ বৃত্তি বা স্মারক উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত হিশাম আবুগারবিয়েহ পুলিশি হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে মামলার আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।