জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন, সহিংসতা ঠেকানো যাচ্ছে না

রংপুরে একটি শিক্ষক পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এই ঘটনাই একমাত্র কারণ নয়। গত কয়েক মাস ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে সারাদেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৯৩৪টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে তিন শতাধিক হত্যার মামলা হয়েছে। দৈনিক হিসাব করলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১০টিরও বেশি।

পুলিশের দেওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোট ২ হাজার ৭৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি, মার্চে ৩১৭টি এবং এপ্রিলে ২৮৮টি মামলা হয়েছে। পরবর্তী তিন মাসেও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা তিন শতাধিকের কাছাকাছি ছিল।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও পরিচালনা) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০টি হত্যার ঘটনা ঘটছে। তাঁর ভাষায়, গড়ে প্রতিদিন ১০টি করে খুন যেন বাস্তবতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্রে অবশ্য সব ধরনের অপরাধ একই হারে বাড়ছে না। পুলিশ সদর দপ্তরের দাবি, চুরি ও ডাকাতির মতো কিছু অপরাধের পরিমাণ আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত নিয়ন্ত্রণ এখনো আসেনি।

হত্যাকাণ্ডের কারণও এক নয়। ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক কলহ, পূর্বশত্রুতা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। আবার সংঘবদ্ধ সহিংসতা কিংবা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। ফলে শুধু ঘটনার পর গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়; অপরাধের কারণ চিহ্নিত করে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যেসব ঘটনায় আসামিদের চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে বাহিনীটি।

অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য পরিস্থিতির আরেকটি দিক সামনে এনেছে। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় ১৩৪ জন মারা গেছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৭৭ জন।

এই পরিসংখ্যানগুলো দেখাচ্ছে, সহিংসতার ধরন একাধিক হলেও প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের জায়গাটি ক্রমেই বড় হচ্ছে। বিশেষ করে মব সহিংসতায় মৃত্যুর ঘটনা জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। কোনো অপরাধের বিচার আইনগত প্রক্রিয়ায় না গিয়ে জনতার হাতে চলে গেলে সেখানে ভুল ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার নয়, মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করা, অপরাধের পেছনের কারণ চিহ্নিত করা, সহিংসতার সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ ও তথ্য দেওয়ার বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

প্রতিদিন গড়ে ১০টির বেশি হত্যার মামলা হওয়ার তথ্য তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের নিরাপত্তাবোধ, আইনের শাসনের প্রতি আস্থা এবং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর জনসাধারণের প্রত্যাশা। হত্যাকাণ্ডের এই প্রবণতা কমাতে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ কতটা নেওয়া হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর