রাজবাড়ী জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র কাপড় বাজারে পুলিশের হাত ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় এক নারীকে প্রকাশ্যে লাথি মারার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেই কয়েকজন যুবক ও ব্যবসায়ী ওই নারীকে একে একে সজোরে লাথি মারছেন—এমন দৃশ্য প্রকাশ্যে আসতেই চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। রোববার রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, শনিবার সকালে কাপড় বাজার এলাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনা ঘটে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, এক নারী পুলিশ সদস্য এক নারীকে হাত ধরে নিরাপদে নিয়ে যাচ্ছেন। ঠিক পেছনেই হেঁটে আসছিলেন দুইজন পুরুষ পুলিশ সদস্য। সেই মুহূর্তে হঠাৎ এক যুবক দৌড়ে এসে ভুক্তভোগী নারীকে সজোরে লাথি মারেন। পেছনে থাকা পুলিশ সদস্য তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে না করতেই আরও এক যুবক এবং তাঁর পরপরই আরেক ব্যক্তি এগিয়ে এসে ওই নারীকে আবার লাথি দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার সূচনা ঘটে শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে। রাজবাড়ী শহরের পান্না চত্বর থেকে ৪০-৫০ জন নারী ব্যবসায়ী জাকিয়া সুলতানাকে হুমকির প্রতিবাদে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি ১ নম্বর রেলগেট প্রদক্ষিণ করে কাপড় বাজারের কাদেরিয়া মার্কেটে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী জাকিয়া সুলতানা ঘোষণা দেন, হুমকির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তিনি কাদেরিয়া সুপার মার্কেটে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন। এই ঘোষণার পরপরই মার্কেটের ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ছড়ায়। একপর্যায়ে তাঁরা একজোট হয়ে জাকিয়াকে ধাওয়া দেন। খবর পেয়ে সদর থানা-পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জাকিয়াকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। কিন্তু তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার পথেই পুলিশের সামনে কয়েকজন ব্যবসায়ী ও কর্মচারী তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং লাথি মারেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পুরো বিরোধের নেপথ্যে রয়েছে ‘আস্থা পোশাক শিল্প’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক জাকিয়া সুলতানা। সেখানে শাহানা পারভীন বৃষ্টি নামের এক নারী সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন। জাকিয়ার অভিযোগ, হিসেব-নিকাশ না বুঝিয়ে দিয়েই বৃষ্টি চাকরি ছেড়ে দেন এবং একই বাজারে নতুন দোকান খোলেন। চাকরি ছেড়ে আলাদা ব্যবসা শুরু করা নিয়ে দুইজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, বৃষ্টির দোকান বন্ধ করার জন্য জাকিয়া কাপড় বাজার কমিটির সভাপতি আজিজ মন্ডলকে চাপ দিয়েছিলেন। সভাপতি রাজি না হওয়ায় তাঁর সঙ্গে জাকিয়ার তীব্র বাগবিতণ্ডা হয় এবং ব্যবসায়ীরা জাকিয়াকে সরিয়ে দেন। এই ঘটনাকে হামলা ও হুমকি দাবি করেই জাকিয়া নারীদের নিয়ে মিছিলে নামেন।
জাকিয়া সুলতানা জানান, গত ২৩ আগস্ট ১৫-২০ জনকে নিয়ে বৃষ্টি তাঁর প্রতিষ্ঠানে ঢুকে হুমকি দেন। শনিবার ব্যবসায়ীদের ধাওয়ার পর পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করলেও পুলিশের উপস্থিতিতেই তাঁকে লাথি মেরে লাঞ্ছিত করা হয়। এই ঘটনার পর তাঁর কারখানা বন্ধ রয়েছে, ফলে সেখানে কর্মরত নারীকর্মীরা চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
অন্যদিকে রাজবাড়ী চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি ও বাজার কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন জানান, নারী উদ্যোক্তা হিসেবে জাকিয়াকে তারা স্বাগত জানালেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও বেতন না দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছিলেন। এ নিয়ে আগে তাঁকে ১০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল। নতুন করে এক কর্মীর সঙ্গে ঝামেলা হলে ব্যবসায়ীরা সমাধানের চেষ্টা করলেও তিনি তা মানেননি।
ঘটনার পর বাজারের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রেখে জাকিয়া ও তাঁর সঙ্গীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করে রাজবাড়ী সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ জানান, বর্তমানে রাজবাড়ী কাপড় বাজারের পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত রয়েছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ দেখে লাথি মারার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।









