পাকিস্তানি সংগীতের জনপ্রিয় গান ‘পাসুরি’ ইউটিউবে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ভিউয়ের মাইলফলক ছুঁয়ে নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে। ২০২২ সালে কোক স্টুডিওর ১৪তম আসরে প্রকাশিত আলী শেঠি ও শায়ি গিলের গানটি এখন পাকিস্তানের প্রথম মিউজিক ভিডিও, যা ইউটিউবে ১০০ কোটি ভিউ অতিক্রম করেছে। চার বছরের বেশি সময় ধরে শ্রোতাদের আগ্রহ ধরে রেখে গানটির এই অর্জন পাকিস্তানি সংগীতের বৈশ্বিক বিস্তারেরও একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
২০২২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশের পর থেকেই ‘পাসুরি’ দ্রুত শ্রোতাদের মনোযোগ কাড়ে। আলী শেঠির সঙ্গে শায়ি গিলের কণ্ঠের সমন্বয়, লোকজ সংগীতের আবহ এবং আধুনিক সংগীতায়োজন গানটিকে অন্য অনেক সমসাময়িক গানের চেয়ে আলাদা করে তোলে। পাকিস্তানি সংস্কৃতি ও সংগীতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেও গানটির উপস্থাপনায় ছিল আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার মতো আধুনিকতা।
প্রকাশের পর গানটি শুধু পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন স্ট্রিমিং সেবার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে ‘পাসুরি’। গানটির সাফল্য এতটাই বিস্তৃত হয় যে ভাষা না বুঝেও বহু আন্তর্জাতিক শ্রোতা এর সুর ও পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত হন।
১০০ কোটি ভিউ পূর্ণ হওয়ার খবরটি উদযাপন করেছে কোক স্টুডিও। তাদের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে এই অর্জনের জন্য শ্রোতা ও ভক্তদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। একটি গান প্রকাশের কয়েক বছর পরও একইভাবে দর্শক-শ্রোতার কাছে জনপ্রিয় থাকা ডিজিটাল যুগে ‘পাসুরি’র বিশেষ অবস্থানকেই তুলে ধরে।
ইউটিউবের বাইরেও গানটির সাফল্য বেশ বড়। স্পটিফাইয়ে ‘পাসুরি’র স্ট্রিম সংখ্যা ৪০ কোটি ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে। ফলে এটি পাকিস্তানি সংগীতের সবচেয়ে বেশি শোনা গানগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে। একই গানের ভিডিও প্ল্যাটফর্মে ১০০ কোটি ভিউ এবং অডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে কয়েক শ কোটি স্ট্রিমের কাছাকাছি পৌঁছানো প্রমাণ করে, গানটির জনপ্রিয়তা কোনো একটি প্ল্যাটফর্ম বা নির্দিষ্ট শ্রোতাগোষ্ঠীর মধ্যে আটকে নেই।
গুগলের সার্চ ডেটাতেও ‘পাসুরি’র ব্যাপক জনপ্রিয়তার প্রতিফলন দেখা যায়। ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি সার্চ হওয়া গানগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। একই বছর গুগলের ‘হাম টু সার্চ’ ফিচারেও গানটি শীর্ষে জায়গা করে নেয়। অর্থাৎ শুধু গানটি শোনা নয়, এর নাম, শিল্পী ও উৎস সম্পর্কেও আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
‘পাসুরি’র ১০০ কোটি ভিউয়ের পেছনে আন্তর্জাতিক দর্শকদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গানটির ইউটিউব ভিউয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ এসেছে পাকিস্তানের বাইরের দর্শকদের কাছ থেকে। aবিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশে গানটির ভিডিও দেখা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান দেখায়, একটি নির্দিষ্ট দেশের ভাষায় তৈরি গানও কীভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভৌগোলিক ও ভাষাগত সীমা অতিক্রম করতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিনোদন অঙ্গনেও ‘পাসুরি’র উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। মার্ভেল স্টুডিওর সিরিজ ‘মিস মার্ভাল’-এ গানটি ব্যবহৃত হওয়ায় এটি আরও বড় আন্তর্জাতিক দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যায়। সিরিজটিতে গানটির উপস্থিতি পাকিস্তানি সংগীতকে বৈশ্বিক পপ সংস্কৃতির একটি পরিচিত পরিসরে নিয়ে আসে। এর ফলে গানটির আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়।
‘পাসুরি’র জনপ্রিয়তাকে ঘিরে পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদ্যোগও দেখা যায়। কোক স্টুডিও আফ্রিকা গানটির একটি আফ্রোবিটস সংস্করণ প্রকাশ করে। ওই সংস্করণে আলী শেঠির সঙ্গে ছিলেন মারওয়ান মুসা ও রিকাডো ব্যাংকস। ভিন্ন অঞ্চল ও সংগীতধারার শিল্পীদের অংশগ্রহণে তৈরি এই সংস্করণ ‘পাসুরি’র আবেদন যে একটি নির্দিষ্ট সংগীতভূগোলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সেটিও স্পষ্ট করে।
গানটির সাফল্যের অন্যতম কারণ এর সংগীতের বৈশিষ্ট্য। ‘পাসুরি’তে পাকিস্তানি লোকজ ও আঞ্চলিক সংগীতের উপাদানের সঙ্গে আধুনিক সংগীতের সমন্বয় করা হয়েছে। আলী শেঠির কণ্ঠের পাশাপাশি শায়ি গিলের পরিবেশন গানটিতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। ফলে এটি একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ও সমকালীন—দুই ধরনের শ্রোতার কাছেই আবেদন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ডিজিটাল যুগে কোনো গানের জনপ্রিয়তা শুধু প্রকাশের সময়কার সাড়া দিয়ে বিচার করা হয় না; বরং দীর্ঘ সময় ধরে সেটি নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে পারছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় ‘পাসুরি’ ব্যতিক্রমী। ২০২২ সালে প্রকাশিত গানটি কয়েক বছর পরও নতুন দর্শক-শ্রোতা পাচ্ছে এবং ইউটিউবের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে ধারাবাহিকভাবে ভিউ বাড়িয়ে চলেছে।
১০০ কোটি ভিউয়ের এই রেকর্ড তাই আলী শেঠি ও শায়ি গিলের জন্য যেমন বড় অর্জন, তেমনি পাকিস্তানি সংগীতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘পাসুরি’ দেখিয়েছে, স্থানীয় সংস্কৃতি ও সংগীতের শিকড় ধরে রেখে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছেও পৌঁছানো সম্ভব। একটি গান কীভাবে দেশের সীমানা পেরিয়ে বৈশ্বিক শ্রোতাদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে, ‘পাসুরি’র দীর্ঘ জনপ্রিয়তা তারই শক্তিশালী উদাহরণ।









