পরিবহন খাতের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বিত নির্দেশনা জারি

দেশের পরিবহন খাতের সেবা ও এর বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে এবং প্রক্রিয়াটি আরও সহজতর করতে একটি নতুন সমন্বিত সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে এই নির্দেশনা প্রদান করা হয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন, বিদেশি এয়ারলাইন্স এবং শিপিং কোম্পানির কার্গো সেবার টিকিট ইস্যু ও চার্জ সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটি একীভূত নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রবর্তন করা হয়েছে। মূলত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা আনা এবং বিদ্যমান অস্পষ্টতা দূর করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।

সার্কুলারের প্রেক্ষাপট ও আইনি ভিত্তি

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭-এর ২০(৩) ধারা অনুযায়ী এই নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এই সমন্বিত সার্কুলারটি জারির তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা আসে, তবে তা এই কাঠামোর সঙ্গেই সমন্বয় করা হবে। এর আগে পরিবহন খাতের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের জন্য বিভিন্ন সময়ে আলাদা আলাদা সার্কুলার জারি করা হয়েছিল, যা অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করত। এখন সব নির্দেশনাকে একটি দলিলে নিয়ে আসায় বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা সহজ হবে।

অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহ ও পরিধি

এই নতুন নির্দেশনায় পরিবহন খাতের প্রায় সব ধরনের আন্তর্জাতিক লেনদেনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • আন্তর্জাতিক যাত্রী ও কার্গো সেবা: আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী এয়ারলাইন্স ও শিপিং লাইনের টিকিট বিক্রয় এবং ফ্রেইট চার্জ সংগ্রহ।

  • রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান: বাংলাদেশ বিমান এবং বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সংক্রান্ত বিশেষ বিধান।

  • বেসরকারি খাত: বেসরকারি এয়ারলাইন্স, শিপিং কোম্পানি, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস এবং ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা।

  • হিসাব পরিচালনা: বিদেশি ও দেশি শিপিং বা এয়ারলাইন্সের নামে খোলা বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব (FC Account) ব্যবস্থাপনা।

  • ট্যুর অপারেটর: ক্রমবর্ধমান পর্যটন খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ট্যুর অপারেটরদের লেনদেন সংক্রান্ত হালনাগাদ নির্দেশনা।

বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন কাঠামোর সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

পরিবহন খাতের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের জন্য প্রযোজ্য প্রধান ক্ষেত্রগুলো নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:

সেবার ধরণসংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহমূল নির্দেশনার বিষয়বস্তু
যাত্রী পরিবহনএয়ারলাইন্স ও ট্রাভেল এজেন্টটিকিট ইস্যু এবং সংগৃহীত অর্থ বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া।
কার্গো ও লজিস্টিকসশিপিং কোম্পানি ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারকার্গো ফ্রেইট সংগ্রহ এবং ফরেন কারেন্সি রিটেনশন কোটা।
রাষ্ট্রীয় পরিবহনবিমান ও শিপিং করপোরেশনআন্তর্জাতিক কেনাকাটা ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়।
কুরিয়ার সার্ভিসআন্তর্জাতিক কুরিয়ার কোম্পানিরয়্যালটি এবং সেবা মাশুল বিদেশে প্রেরণ সংক্রান্ত নিয়ম।
পর্যটন সেবানিবন্ধিত ট্যুর অপারেটরবিদেশগামী পর্যটকদের জন্য প্যাকেজ মূল্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা।

প্রভাব ও লক্ষ্য

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই সমন্বিত সার্কুলারের ফলে বহির্গামী রেমিট্যান্স (Outward Remittance) পাঠানোর প্রক্রিয়াটি পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি স্বচ্ছ হবে। আগে বিভিন্ন অস্পষ্টতার কারণে রেমিট্যান্স অনুমোদনে যে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতো, তা এখন হ্রাস পাবে। একই সাথে এটি অননুমোদিত উপায়ে অর্থ পাচার রোধে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মতো উদীয়মান খাতগুলোতে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত হবে।

এই নির্দেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত একটি ‘ওয়ান-স্টপ’ গাইডলাইন প্রদান করেছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজীকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে অবিলম্বে এই নির্দেশনা কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।