ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে দেশটির চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। রোববার (২৫ জানুয়ারি, ২০২৬) কেন্দ্রীয় সরকার এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের জন্য ৪৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম ঘোষণা করেছে। প্রতি বছরের মতো এবারও পুরস্কারের তালিকায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছেন ‘আনসাং হিরো’ বা সেই সকল নিভৃতচারী ব্যক্তিত্ব, যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে সমাজ সংস্কার ও জনকল্যাণে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। একজন বাস কন্ডাক্টর থেকে শুরু করে বিলুপ্তপ্রায় বাদ্যযন্ত্রের শিল্পী—এবারের বিজয়ীরা বৈচিত্র্যময় জীবনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
Table of Contents
কন্ডাক্টর থেকে জ্ঞানসাধক: আঙ্কে গৌড়ার রূপকথা
এবারের তালিকার অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ী নাম কর্ণাটক রাজ্যের মহিশূর জেলার ৭৫ বছর বয়সী আঙ্কে গৌড়া। জীবনের অনেকটা সময় বাসের কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করা এই সাধারণ মানুষটি আজ এক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের অধিপতি। তাঁর একাগ্র চেষ্টায় গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম উন্মুক্ত গ্রন্থাগার ‘পুস্তক মানে’। যেখানে ২০টি ভাষায় লেখা প্রায় ২০ লাখেরও বেশি বই এবং অসংখ্য দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। সাধারণ মানুষের জন্য জ্ঞানের দুয়ার উন্মুক্ত করে দেওয়ার এই বিরল কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবেই তিনি পদ্মশ্রীতে ভূষিত হলেন।
পদ্মশ্রী প্রাপ্ত কয়েকজন শ্রেষ্ঠ ‘আড়ালের নায়ক’ ও তাঁদের অবদান:
| ব্যক্তিত্বের নাম | পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য | সমাজ ও সংস্কৃতিতে অবদান |
| আঙ্কে গৌড়া | প্রাক্তন বাস কন্ডাক্টর। | বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ও ২০ লাখ বই সংগ্রহ। |
| ডা. আরমিদা ফার্নান্দেস | বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ। | এশিয়ায় প্রথম হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক স্থাপন করে শিশু মৃত্যুহার হ্রাস। |
| ভিকলিয়া লাদকিয়া ধিন্ডা | ৯০ বছর বয়সী আদিবাসী শিল্পী। | বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় বাদ্যযন্ত্র ‘তার্পা’ বাজানো ও লোকসংস্কৃতি রক্ষা। |
| এ বছরের মোট বিজয়ীরা | ৪৫ জন (আড়ালের নায়ক)। | শিক্ষা, জনসেবা, শিল্পকলা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে নীরব বিপ্লব। |
এশিয়ায় প্রথম ‘মিল্ক ব্যাংক’ ও ডা. আরমিদার লড়াই
মুম্বাইয়ের প্রথিতযশা শিশু চিকিৎসক ডা. আরমিদা ফার্নান্দেস তাঁর বৈপ্লবিক চিকিৎসার জন্য এই সম্মাননা লাভ করেছেন। তিনি এশিয়ায় প্রথম ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ বা মানব দুগ্ধ ব্যাংক স্থাপন করেন। অনেক শিশু জন্মের পর মাতৃদুগ্ধের অভাবে অপুষ্টি ও নানা জটিলতায় ভোগে; ডক্টর আরমিদার এই ব্যাংক অসংখ্য নবজাতকের জন্য জীবনদায়ী হিসেবে কাজ করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর এই সুদূরপ্রসারী ও মানবিক উদ্যোগ ভারতের স্বাস্থ্য খাতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
আদিবাসী ঐতিহ্যের অতন্দ্র প্রহরী
মহারাষ্ট্রের ৯০ বছর বয়সী শিল্পী ভিকলিয়া লাদকিয়া ধিন্ডা প্রমাণ করেছেন যে শিল্পসাধনার কোনো বয়স নেই। বিলুপ্তপ্রায় আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র ‘তার্পা’ বাজানোর মাধ্যমে তিনি কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যকে সজীব রেখেছেন। লাউ এবং বাঁশ দিয়ে তৈরি এই বাদ্যযন্ত্রটির সুর যেন তাঁর আঙুলেই কথা বলে। বিলীন হতে বসা এই লোকজ উত্তরাধিকারকে আগলে রাখার জন্য রাষ্ট্র তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মানে সিক্ত করেছে।
উপসংহার
পদ্মশ্রী পুরস্কারের এই নবতর ধারাটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত সাফল্য কেবল খ্যাতি বা প্রাচুর্যের মাঝে নেই, বরং তা লুকিয়ে আছে মানুষের কল্যাণে করা নিঃস্বার্থ কাজের মাঝে। ভারত সরকার এই ‘আড়ালের নায়ক’দের সম্মানিত করার মাধ্যমে আসলে তৃণমূল পর্যায়ের শ্রম ও মেধাভিজ্ঞাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করল। আঙ্কে গৌড়া বা আরমিদা ফার্নান্দেসদের মতো মানুষদের সংগ্রাম ও অর্জন আগামী প্রজন্মের জন্য এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
