নেতৃত্ব বিভাজনে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আর্থিক অনিয়ম বিতর্ক চরমে

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আলোচিত সংগঠন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ বর্তমানে গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় যেই প্ল্যাটফর্মটি ছাত্রসমাজের ঐক্য ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল, সেটিই এখন নেতৃত্বের শূন্যতা, সাংগঠনিক বিভাজন এবং গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে তীব্র বিতর্কে জর্জরিত।

সংগঠনের ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-তে যোগ দেওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। সভাপতি রিফাত রশিদ, দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেনসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা সংগঠন থেকে সরে দাঁড়ালে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় জরুরি বৈঠকের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে পাঁচ সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়।

নতুন গঠিত উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন আবু সাঈদ লিওন, হামযা মাহবুব, তারিকুল ইসলাম (রেজা), মুঈনুল ইসলাম এবং শাহাদাত হোসেন। তাদের ওপর আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সংগঠনের কাঠামো পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে সংগঠনের অভ্যন্তরে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। একপক্ষের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হয়নি এবং এটি সম্পূর্ণ একতরফা। অন্যদিকে আরেক অংশের দাবি, নেতৃত্বশূন্যতা ও বাস্তব সংকটের কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না।

সবচেয়ে গুরুতর বিতর্ক তৈরি হয়েছে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। সংগঠনের একাংশ দাবি করছে, বিভিন্ন প্রকল্প, কার্যক্রম ও আন্দোলন পরিচালনার নামে সংগৃহীত বিপুল অর্থের মধ্যে কোটি টাকারও বেশি অর্থের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগকারীদের মতে, এই আর্থিক অনিয়ম প্রকাশ্যে আসার আশঙ্কায়ই সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতা রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে পরিস্থিতি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেন বলেছেন, বিষয়টি মূলত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল। তার দাবি, “এটি সম্পূর্ণ সাংগঠনিক মতবিরোধ। এখানে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ভিত্তিহীন। নেতৃত্ব পরিবর্তনকে কেন্দ্র করেই এই ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।”

উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মুঈনুল ইসলামও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নাকচ করে বলেন, সংগঠনের ভেতরে কোনো ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা বা অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেনি বলে তাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই।

এদিকে সংগঠনের অপর একটি অংশ অভিযোগ করছে, নতুন গঠিত উপদেষ্টা পরিষদেও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তাদের দাবি, কমিটির কিছু সদস্য ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় সংগঠনের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ বিভাজন, নেতৃত্ব সংকট এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ একসঙ্গে সংগঠনটিকে এক জটিল অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত সমঝোতা ও স্বচ্ছ তদন্ত না হলে এই সংগঠন তার পূর্বের অবস্থান ও জনআস্থা হারাতে পারে।

নিচে চলমান সংকটের মূল দিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

বিষয়তথ্য
সংগঠনবৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন
বর্তমান অবস্থাকেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত
নতুন কাঠামো৫ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ
প্রধান সংকটনেতৃত্ব বিভাজন ও আস্থাহীনতা
মূল অভিযোগকোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম
রাজনৈতিক প্রভাবএনসিপিতে নেতাদের যোগদান
বিরোধের কেন্দ্রগঠনতন্ত্র ও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ

সামগ্রিকভাবে, এক সময়ের ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন এখন বহুমুখী সংকটে পড়েছে। নেতৃত্বের ভাঙন, আর্থিক অভিযোগ এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন মিলিয়ে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।