নিরাপত্তার দৈন্যদশা: ২০২৫ সালে ৩ হাজারের বেশি খুন

২০২৫ সাল বাংলাদেশের জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য এক চরম অস্থিরতার বছর হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বছরজুড়ে সারা দেশে সহস্রাধিক হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্য দিবালোকে গোলাগুলি এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নড়বড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুযোগে অপরাধীরা নিয়মিতভাবে দিনের আলোতে অপরাধ সংগঠিত করেছে। বিশেষ করে জমি নিয়ে বিরোধ, চাঁদাবাজি, অবৈধ দখল এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত শতাধিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অসংখ্য প্রাণহানি ঘটেছে।

ভয়াবহ কিছু হত্যাকাণ্ডের উপাখ্যান

বছরের শেষ সময়গুলোতে অপরাধের মাত্রা ছিল উদ্বেগজনক। গত ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে ঢাকা আসার পথে ভোলায় এক ছাত্রদল নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া ৬ ডিসেম্বর রাতে তেজগাঁও কলেজের ছাত্রাবাসে মাদক সংক্রান্ত বিরোধে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মেধাবী শিক্ষার্থী সাকিবুল হাসান রানার মৃত্যু হয়। সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাটি ছিল ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড। গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর প্রকাশ্য রাস্তায় তাঁকে মাথায় গুলি করা হয় এবং ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। একই দিনে ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দিপু চন্দ্র দাস নামে এক শ্রমিককে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার মতো পৈশাচিক ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী।

নিচে ২০২৫ সালের অপরাধ ও সহিংসতার চিত্র একটি পরিসংখ্যানিক সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

২০২৫ সালের অপরাধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিসংখ্যান

বিষয়বস্তুপরিসংখ্যান / তথ্যবিশেষ মন্তব্য
মোট খুনের মামলা৩,২৩৬টি (জানুয়ারি-অক্টোবর)গত ১৫ মাসে মোট মামলা ৪,৮০৯টি।
রাজনৈতিক সহিংসতা১২০ জন নিহত (জানুয়ারি-নভেম্বর)এইচআরএসএস-এর তথ্য অনুযায়ী।
নভেম্বর মাসের চিত্র৯৬টি সহিংসতায় ১২ জন নিহতআহত হয়েছেন প্রায় ৮৭৪ জন।
অক্টোবর মাসের চিত্র৬৪টি সহিংসতায় ১০ জন নিহতআহত হয়েছেন ৫১৩ জন।
গ্রেপ্তার কার্যক্রমপ্রায় ১০,০০০ জন গ্রেপ্তারমূলত মাদক ও সাইবার অপরাধে জড়িত।
অস্ত্র ও সন্ত্রাসঅবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও সন্ত্রাসী পুনরুত্থানআন্ডারওয়ার্ল্ডের সক্রিয়তা বেড়েছে।
নিরাপত্তা সংকট ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সাল ছিল আইনশৃঙ্খলার জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জেল থেকে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুনরায় সক্রিয় হওয়া এবং মাঠপর্যায়ে পুলিশের নমনীয় অবস্থানের সুযোগে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রাজধানীর পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা এবং পলায়নকালে একজন রিকশাচালককে গুলি করার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এর আগে আদালত চত্বরে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন এবং খুলনায় আদালত ভবনের বাইরে দুজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা বিচারিক এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।

যদিও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, তবে বাস্তব চিত্র সাধারণ মানুষের মনে গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।