নতুন সরকারের বাজেট প্রণয়ন ও আর্থিক সংকট মোকাবেলার নির্দেশনা

বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রথমবারের মতো বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন সময়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈদেশিক চাপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ঢাকার ধানমন্ডিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে “নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের জন্য ভাবনা” শীর্ষক আলোচনায় তিনি দেশের অর্থনীতি, সম্ভাব্য নীতি এবং বাজেট প্রণয়নের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন। ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান, জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নাজিবা মোহাম্মদ আলতাফ প্রমুখ।

ভট্টাচার্য জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন বাণিজ্য চুক্তির কারণে রাশিয়া থেকে কম মূল্যে জ্বালানি তেল আমদানি করতে এখন যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হচ্ছে। এর ফলে দেশের জ্বালানি বাজারে কমদামের তেলের সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এখন শুধু বাজেট নির্ভর নয়, বরং বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বৈদেশিক ঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষিতে দেশ তিন ধরনের গুরুতর ঝুঁকির সম্মুখীন:

  1. তরল জ্বালানি সংকট
  2. প্রাকৃতিক গ্যাস ঘাটতি
  3. বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘ্ন

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এই পরিস্থিতিতে বাজেটের জন্য অপেক্ষা না করে অবিলম্বে অর্থসংস্থানে উদ্যোগী হতে হবে। দেশের ধারদেনা বৃদ্ধি, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য চাপে থাকা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা এবং খাদ্যের মূল্যস্ফীতি একত্রে অর্থনৈতিক জটিলতা তৈরি করেছে।

তিনি জ্বালানি তেল আমদানি ও বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনটি পদক্ষেপের পরামর্শ দেন:

  • আমদানি সম্প্রসারণ করে সরবরাহ বৃদ্ধি করা
  • দাম কম রাখতে কর ও আবগারি শুল্ক হ্রাস করা
  • ভর্তুকি সুষমভাবে পুনর্বিন্যস্ত করা

সরকারি ব্যয় ও আর্থিক শৃঙ্খলা

ভট্টাচার্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পর্যালোচনার জন্য টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দেন, যা এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। সরকারি কলকারখানা লাভজনক করার ওপর জোর দিতে হবে; অকার্যকর কলকারখানাগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়ে দায়দেনা পরিশোধ করা যেতে পারে। সরকারী শেয়ার বিক্রি করে শেয়ারবাজারকে উজ্জীবিত করা সম্ভব এবং রাজস্ব সংকটও কিছুটা হ্রাস পাবে।

রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য তিনি কর অবকাশ ও সুবিধা সীমিত করার, করজাল বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন। এছাড়া সম্পদের ওপর কর আরোপ এবং এনবিআরের কার্যক্রমকে দ্রুত বাস্তবায়ন করার গুরুত্ব তিনি উল্লেখ করেন।

সাম্প্রতিক আর্থিক পরিসংখ্যান

বিষয়তথ্য
২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব হারানো২,৭২,৮৫০ কোটি টাকা (জিডিপির ৬.৮৭%)
২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রণোদনা৩২,২৩০ কোটি টাকা (কৃষি, রপ্তানি, পাটপণ্য, প্রবাসী আয়, জিডিপির ০.৬০%)
জ্বালানি আমদানি বাধারাশিয়া থেকে কম মূল্যে তেল আমদানি করতে যুক্তরাষ্ট্র অনুমতি প্রয়োজন
মূল্যস্ফীতিখাদ্য ও সাধারণ জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানদুর্বলতা বজায়, বিশেষ করে বেসরকারি খাতে

ভট্টাচার্য ব্রিফিংয়ে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করেন, নতুন সরকারকে অর্থনৈতিক ও বাজেট পরিকল্পনায় নীতি-নির্ভর, বাস্তবসম্মত এবং স্বচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রাজস্ব সুষমীকরণ, সরকারি ব্যয় হ্রাস, শেয়ার ও সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং জ্বালানি আমদানি নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নতুন সরকারের বাজেটকে সফল করার মূল চাবিকাঠি।