জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই আগস্ট ২০২৬, ৮:২৭ পিএম

মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের জন্য সাম্প্রতিক সময়টা খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। একের পর এক বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তির পর প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় স্টুডিওকে বক্স অফিসে চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ যেন নতুন করে আশার আলো দেখাল। মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তেই সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ১১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আয় করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই আয় দিয়ে ছবিটি ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উদ্বোধনী আয়ের রেকর্ড গড়েছে। এর সামনে রয়েছে শুধু ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’। সিনেমাটির উদ্বোধনী সপ্তাহান্তের আয় ছিল প্রায় ১২২ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, মুক্তির মাত্র তিন দিনেই ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’ বক্স অফিসে যে সাড়া ফেলেছে, তা শুধু মার্ভেল নয়, পুরো হলিউডের সাম্প্রতিক সাফল্যের তালিকাতেও উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে।
সিনেমাটির আনুমানিক নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। সেই হিসাবে প্রথম সপ্তাহান্তের আয়েই ছবিটি তার প্রযোজনার খরচের কয়েক গুণ বেশি অর্থ তুলে নিয়েছে। অবশ্য বক্স অফিসের মোট আয় এবং নির্মাতাদের প্রকৃত মুনাফা এক বিষয় নয়; প্রেক্ষাগৃহের অংশ, বিপণন ব্যয় ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পরই একটি ছবির প্রকৃত আর্থিক সাফল্য নির্ধারিত হয়। তবু উদ্বোধনী আয় যে সিনেমাটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে অনেকটাই শক্তিশালী করেছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
Table of Contents
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাজারে ছবিটির উদ্বোধনী আয়ও ছিল অসাধারণ। প্রথম সপ্তাহান্তে উত্তর আমেরিকায় সিনেমাটি আয় করেছে প্রায় ৩৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এই পরিসংখ্যান তাকে ওই অঞ্চলের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উদ্বোধনী আয় করা ছবির তালিকায় নিয়ে এসেছে।
এ ক্ষেত্রেও শীর্ষে রয়েছে ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’, যার উদ্বোধনী আয় ছিল প্রায় ৩৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, মাত্র ২০ লাখ ডলারের ব্যবধানে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’। এমন সামান্য ব্যবধানই দেখিয়ে দিচ্ছে, নতুন স্পাইডার-ম্যান সিনেমাটি উত্তর আমেরিকার দর্শকদের মধ্যে কতটা শক্তিশালী আগ্রহ তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও এসেছে বড় অঙ্কের আয়। বিভিন্ন দেশের প্রেক্ষাগৃহ মিলিয়ে ছবিটি পেয়েছে প্রায় ৫৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। বিশ্বের ৭৩ হাজারের বেশি পর্দায় মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে বড় অবদান এসেছে চীন থেকে, যেখানে উদ্বোধনী আয় প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখ ডলার। যুক্তরাজ্য থেকেও প্রথম সপ্তাহান্তে এসেছে প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’-এর ঘটনাপ্রবাহের কয়েক বছর পরের সময়কে কেন্দ্র করে ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’র গল্প এগিয়েছে। আবারও পিটার পার্কার বা স্পাইডার-ম্যানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন টম হল্যান্ড।
তবে এবারের গল্পে পিটারকে এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। এমন এক পৃথিবীতে তাকে অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়, যেখানে তার আসল পরিচয় কেউ জানে না। ফলে সুপারহিরো হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অনেকটাই একা। পরিচিত মানুষ, সম্পর্ক এবং স্বাভাবিক জীবনের আকাঙ্ক্ষা—সবকিছু মিলিয়ে একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এমজে চরিত্রে অভিনয় করেছেন জেনডায়া। পিটার ও এমজের সম্পর্কের জটিলতা এবং তাঁদের পর্দার রসায়নও দর্শকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। বাস্তব জীবনেও টম হল্যান্ড ও জেনডায়ার সম্পর্ক রয়েছে, ফলে তাঁদের জুটি নিয়ে দর্শকের আগ্রহ সিনেমার বাইরেও যথেষ্ট।
বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি ছবিটি সমালোচকদের কাছ থেকেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। বেশ কিছু সমালোচক টম হল্যান্ডের অভিনয়কে বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন এবং স্পাইডার-ম্যান চরিত্রে এটিকে তাঁর অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মার্ভেল স্টুডিওসের সভাপতি কেভিন ফাইগিও ছবিটির উদ্বোধনী সাফল্যকে অসাধারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিনেমাটি বড় পর্দায় দেখার জন্য যেভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল, দর্শকের প্রতিক্রিয়ায় সেই অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন ঘটেছে।
‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’র সাফল্য মার্ভেল স্টুডিওসের জন্য শুধু একটি বক্স অফিস রেকর্ড নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ারও সুযোগ। সাম্প্রতিক সময়ে ‘দ্য মার্ভেলস’ এবং ‘থান্ডারবোল্টস’-এর মতো বড় বাজেটের সিনেমা প্রত্যাশিত মাত্রায় দর্শক টানতে পারেনি। এসব ছবির সাফল্য নিয়ে স্টুডিওর ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, নতুন স্পাইডার-ম্যান সিনেমার বিপুল উদ্বোধনী আয় সেই পরিস্থিতিকে অনেকটাই বদলে দিতে পারে।
বিশেষ করে সামনে থাকা বড় প্রকল্পগুলোর জন্য এই সাফল্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্ভেলের অন্যতম আলোচিত ভবিষ্যৎ ছবি ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’কে ঘিরে দর্শকের আগ্রহও নতুন স্পাইডার-ম্যান সিনেমার সাফল্যের কারণে আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মার্ভেল ও সনি পিকচার্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র স্পাইডার-ম্যান। ২০২১ সালের ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’ বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটি ডলার আয় করেছিল। সেই ছবির পর নতুন সিনেমাকে ঘিরে প্রত্যাশাও ছিল স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি।
‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’র উদ্বোধনী ফলাফল আপাতত সেই প্রত্যাশাকে আরও জোরালো করেছে। সামগ্রিকভাবে সুপারহিরো সিনেমার প্রতি দর্শকের আগ্রহ নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও স্পাইডার-ম্যান যে এখনো বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী দর্শকভিত্তি ধরে রেখেছে, এই সাফল্য তারই প্রমাণ দিচ্ছে।
করোনা মহামারির পর বিশ্বজুড়ে সিনেমা হলের ব্যবসায় বড় পরিবর্তন এসেছে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের বিস্তার দর্শকের সিনেমা দেখার অভ্যাসও বদলে দিয়েছে। তবে বড় পর্দার অভিজ্ঞতার প্রতি দর্শকের আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বড় বাজেটের আকর্ষণীয় সিনেমা মুক্তি পেলে এখনো বিপুল দর্শক প্রেক্ষাগৃহে ফিরছেন।
২০২৬ সালে বক্স অফিসের সামগ্রিক চিত্রও সেই প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। উত্তর আমেরিকার বার্ষিক বক্স অফিস আয় ২০১৯ সালের পর আবার ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর পথে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বছরে ‘টয় স্টোরি ৫’, ‘মাইকেল’ এবং ‘দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি’ এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে। ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ এবং ক্রিস্টোফার নোলান পরিচালিত ‘দ্য ওডিসি’ও সেই মাইলফলকের দিকে এগোচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে বক্স অফিসের এই পুনরুজ্জীবনের গল্প শুধু বড় বাজেটের সিনেমায় সীমাবদ্ধ নয়। স্বল্প বাজেটের স্বাধীন ধারার ছবিও দর্শকের মনোযোগ কেড়েছে। ‘অবসেশন’ ও ‘ব্যাকরুমস’-এর মতো স্বাধীন হরর সিনেমার উল্লেখযোগ্য আয় দেখিয়েছে, শক্তিশালী গল্প এবং দর্শকের মুখে মুখে প্রচার থাকলে বড় তারকা বা বিপুল বাজেট ছাড়াও বিশ্ববাজারে সাফল্য পাওয়া সম্ভব।
সব মিলিয়ে ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’র উদ্বোধনী সাফল্য একই সঙ্গে দুটি বার্তা দিচ্ছে। একদিকে এটি স্পাইডার-ম্যান চরিত্রটির দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা আবারও সামনে এনেছে, অন্যদিকে বড় পর্দার সিনেমা ঘিরে বিশ্বজুড়ে দর্শকের আগ্রহ এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী—বিশেষ করে যখন গল্প, চরিত্র ও বিনোদনের উপস্থাপনা দর্শকের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলে যায়।
মন্তব্য