নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক খাতে নজিরবিহীন দুর্নীতির পাহাড় জমেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু হাজ্জাজের বিরুদ্ধে জেনারেটরের জ্বালানি তেল চুরি থেকে শুরু করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারের প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা এই অনিয়মের শিকড় এতটাই গভীরে যে, স্থানীয়রা একে ‘অদৃশ্য লুটপাট’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তাঁরা অনতিবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও বিশেষ অডিটের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
Table of Contents
অদৃশ্য ডিজেল ও ভুয়া বিলের বিশাল কারবার
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নীলফামারীতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিংয়ের মাত্রা অত্যন্ত কম হওয়া সত্ত্বেও জেনারেটর চালানোর নামে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ডিজেল ক্রয়ের ভুয়া বিল উত্তোলন করা হয়েছে। বাস্তবে জেনারেটর ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন না পড়লেও তেলের টাকা নিয়মিতভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী দাবি করেছেন। এছাড়া আইটি, পরিবহন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খাতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ দেখানো হলেও হাসপাতালের সেবার মান অত্যন্ত শোচনীয়।
নীলফামারী সরকারি হাসপাতালের দুর্নীতির প্রধান খাতসমূহ:
| দুর্নীতির ক্ষেত্র | অভিযোগের বিবরণ ও সম্ভাব্য আত্মসাৎ |
| জেনারেটরের জ্বালানি | বিদ্যুৎ বিভ্রাটহীন সময়েও ৩০ লাখ টাকার ডিজেলের ভুয়া বিল। |
| ঠিকাদারি কমিশন | অডিটের অজুহাতে এমএসআর খাত থেকে ৫ শতাংশ অর্থ আদায়। |
| পরিবহন খাতের লুটপাট | অ্যাম্বুলেন্সে ব্যক্তিগত মালামাল টানা ও জ্বালানি তেলের ভুয়া খরচ। |
| পরিচ্ছন্নতা ও আইটি | কোনো কাজ না করেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা উত্তোলন। |
| নিয়োগ ও স্বজনপ্রীতি | আউটসোর্সিং নিয়োগে অনিয়ম ও পছন্দের লোকদের কাজ প্রদান। |
| মোট সম্ভাব্য আত্মসাৎ | বিগত চার বছরে আনুমানিক ২০ কোটি টাকা। |
ঠিকাদারদের জিম্মি করে কমিশন বাণিজ্য
হাসপাতালের এমএসআর (মেডিকেল স্টোরস রুলস) খাতের কেনাকাটা ও সরবরাহকাজেও দুর্নীতির জাল বিস্তৃত। ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, বিল পাশ করানোর জন্য অডিটের নাম করে মোট বিলের ৫ শতাংশ হারে টাকা তত্ত্বাবধায়ককে প্রদান করতে হয়। এই অনৈতিক কমিশন না দিলে বিল আটকে রাখা হয়। এছাড়া হাসপাতালের শয্যার চাদর ও লিনেন সামগ্রী ধোয়ার কাজেও নিজের পছন্দের লোকদের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ডা. আবু হাজ্জাজের বিরুদ্ধে।
অ্যাম্বুলেন্সের অপব্যবহার ও প্রশাসনিক প্রভাব
অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স রোগীদের পরিবর্তে রংপুর থেকে তত্ত্বাবধায়কের ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক মালামাল পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। এতে তেলের অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে সরকারি তহবিল থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কর্মচারীদের মতে, গত চার বছর ধরে এখানে কোনো জবাবদিহি নেই। ঊর্ধ্বতন মহলের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে সুসম্পর্ক থাকায় তিনি দীর্ঘসময় একই স্থানে বহাল রয়েছেন এবং কার্যত ‘স্বৈরশাসন’ চালাচ্ছেন।
উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও অডিটের দাবি
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু হাজ্জাজের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব থেকে না সরিয়ে তদন্ত করলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে না। তাঁরা বিগত চার বছরের যাবতীয় আয়-ব্যয়ের একটি নিরপেক্ষ ও বিশেষ অডিট দাবি করেছেন, যাতে সাধারণ মানুষের করের টাকার সঠিক হিসাব বেরিয়ে আসে।
