খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জানুয়ারি ২০২৬, ৬:৩৩ এএম

একটি কণ্ঠস্বর, যা একাত্তরের অন্ধকার দিনগুলোতে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের কোটি মানুষের কানে পৌঁছে দিত আশার অমলিন আলো। একটি নাম, যা বিশ্ববিবেকের রুদ্ধ দ্বারে করাঘাত করে উন্মোচন করেছিল একটি জাতির মুক্তির আকুল সংগ্রাম। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের চিরস্মরণীয় সুহৃদ এবং বিবিসির কিংবদন্তি সাংবাদিক স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি আজ আমাদের মাঝে নেই। গত ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে দিল্লির একটি হাসপাতালে ৯০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (১৯৩৫-২০২৬)। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল এবং বাংলাদেশ হারালো তার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য সাক্ষী ও পরম সুহৃদকে।
Table of Contents
১৯৭১ সালের সেই উত্তাল ও বিভীষিকাময় দিনগুলোতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশে নৃশংস গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন মার্ক টালি ছিলেন সেই সত্যের প্রধান বার্তাবাহক। তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনী ও অসামান্য কণ্ঠের মাধ্যমে সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের খবর বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। সেই সময়ে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ‘বিবিসি’ শোনা মানেই ছিল মার্ক টালির সংবাদের ওপর অগাধ আস্থা রাখা। তিনি কেবল খবর পড়তেন না, বরং তাঁর সংবাদে ফুটে উঠত এক জাতির বেঁচে থাকার আকুতি। তিনি সীমান্ত অঞ্চলের শরণার্থী শিবিরগুলো ঘুরে ঘুরে মানুষের দুঃখ-দুর্দশার যে চিত্র তুলে ধরেছিলেন, তা বিশ্ববাসীকে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
স্যার উইলিয়াম মার্ক টালির জীবন ও বিশেষ অর্জনসমূহ:
| তথ্যের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ |
| নাম | স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি (Sir William Mark Tully)। |
| জন্ম-মৃত্যু | ১৯৩৫ সাল (কলকাতা) – ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ (দিল্লি)। |
| প্রাথমিক কর্মস্থল | ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি)। |
| খ্যাতি | দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক দীর্ঘকালীন সংবাদদাতা ও বিশ্লেষক। |
| মুক্তিযুদ্ধে অবদান | একাত্তরের গণহত্যার খবর ও শরণার্থীদের আর্তনাদ প্রচার। |
| বাংলাদেশী সম্মাননা | মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা (বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক)। |
| অন্যান্য উপাধি | নাইটহুড (যুক্তরাজ্য), পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ (ভারত)। |
বাংলাদেশের মানচিত্র সৃষ্টির প্রতিটি বাঁকেই ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। বাংলাদেশের বিজয় থেকে শুরু করে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন—সব কিছুরই তিনি ছিলেন এক নির্ভীক প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁর সাংবাদিকতা কেবল পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল শোষিত মানুষের প্রতি অগাধ মমত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে তাঁর মতো পারদর্শী বিদেশি সাংবাদিক ইতিহাসে বিরল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে। এছাড়া সাংবাদিকতায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘নাইটহুড’ উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর প্রয়াণ সাংবাদিকতা জগতের জন্য এক বিশাল শূন্যতা। বাংলাদেশ আজ তার একজন অকৃত্রিম অভিভাবককে হারালো, যিনি দুঃসময়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন হিমালয়ের মতো দৃঢ়তা নিয়ে।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বিদায়, স্যার মার্ক টালি। বাংলাদেশের ইতিহাস যতদিন থাকবে, বাঙালির বিজয়ের কথা যখনই উচ্চারিত হবে, আপনার নাম সেখানে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আপনি ছিলেন এমন এক বিদেশি বন্ধু, যিনি আমাদের হৃদয়ে নিজের আপন জায়গা করে নিয়েছিলেন। আপনার বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।
মন্তব্য