খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুন ২০২৩, ২:১৭ পিএম

বহুকাল ধরেই বিজ্ঞান বলছে—একটি নতুন প্রাণের সৃষ্টি হয় পুরুষের শুক্রাণু ও নারীর ডিম্বাণুর মিলনে। এটাই মানবজীবনের প্রাকৃতিক এবং জৈবিক ভিত্তি। কিন্তু এবার সেই চিরাচরিত ধারণায় এক প্রকার ‘বিপ্লব’ এনে দিলেন আমেরিকা ও ব্রিটেনের একদল বিজ্ঞানী। তারা গবেষণাগারে এমন এক সিন্থেটিক (কৃত্রিম) মানব ভ্রূণ তৈরি করে দেখিয়েছেন, যেখানে ব্যবহার করা হয়নি শুক্রাণু বা ডিম্বাণু—বরং এই ভ্রূণ গঠিত হয়েছে স্টেম সেল (stem cell)-এর সাহায্যে।
এই গবেষণালব্ধ সাফল্য বৈজ্ঞানিক মহলে যেমন সাড়া ফেলেছে, তেমনি এটি নতুন করে উত্থাপন করেছে জটিল নৈতিক ও আইনি প্রশ্ন। একে কেউ দেখছেন মানব জাতির ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হিসেবে, আবার কেউ দেখছেন জীববিজ্ঞানের সীমা অতিক্রম করে এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পথে পদার্পণের সংকেত।

Table of Contents
গবেষকরা জানিয়েছেন, তাঁরা প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল নামক এক ধরনের কোষ ব্যবহার করেছেন, যেগুলি শরীরের যেকোনো ধরনের কোষে পরিণত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। যথাযথ রাসায়নিক ও পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণে এই কোষগুলোকে এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যাতে তারা নিজেরাই একটি প্রাথমিক ভ্রূণের গঠন অনুকরণ করে।
এই ভ্রূণ বর্তমানে মানুষের গর্ভাবস্থার সবচেয়ে শুরুর পর্যায়—গ্যাস্ট্রুলেশন পর্বের মতো একটি অবস্থায় রয়েছে। তবে এতে এখনও কোনও হৃদস্পন্দন, মস্তিষ্ক, কিংবা পূর্ণাঙ্গ অঙ্গের উপস্থিতি নেই। অর্থাৎ, এটি পূর্ণাঙ্গ মানবশিশু নয়, কিন্তু জীবনের প্রাথমিক ‘নকশা’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই আবিষ্কার ঘিরে বৈজ্ঞানিক সমাজ বিভক্ত।
একদল গবেষক মনে করছেন, মানব ভ্রূণের বিকাশ প্রক্রিয়া বোঝার জন্য এটি এক যুগান্তকারী মাইলফলক। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে জিনগত রোগের কারণ, গর্ভপাতের ঝুঁকি, এমনকি প্রজনন-সংশ্লিষ্ট জটিলতা সম্পর্কে অধিক গভীর জ্ঞান অর্জন সম্ভব হতে পারে। এতে করে IVF-এর বাইরেও শিশু জন্মদানের নতুন পথ উন্মোচিত হতে পারে।
অন্যদিকে, বায়ো-এথিক্স (জীবন-নৈতিকতা) বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে দেখছেন উদ্বেগের চোখে। তাঁদের মতে, শুক্রাণু-ডিম্বাণু ছাড়া ভ্রূণ তৈরি জীবনের মৌলিক সংজ্ঞাকেই চ্যালেঞ্জ করছে।
বিশেষ করে যখন বিশ্বজুড়ে এখনও এই প্রযুক্তির জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন হয়নি, তখন এটি ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণহীন জৈবপ্রযুক্তির দ্বার উন্মোচন করতে পারে, যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে মত অনেকের।

আইভিএফ (In Vitro Fertilisation) প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে একটি স্বীকৃত ও আইনি কাঠামোর আওতাভুক্ত পদ্ধতি। কিন্তু সিন্থেটিক ভ্রূণ তৈরি এখন পর্যন্ত সেই কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়। যার ফলে এর ব্যবহার, প্রয়োগ ও পরিণতি নিয়ে আইনগত স্পষ্টতা অনুপস্থিত।
বিভিন্ন দেশের সরকার ও গবেষণা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসেছে। যুক্তরাজ্যের Human Fertilisation and Embryology Authority (HFEA) এ ব্যাপারে আইন পরিমার্জনের পরামর্শ দিচ্ছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (NIH) ভবিষ্যতে গবেষণার গতি নিয়ন্ত্রণে নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে।
সিন্থেটিক ভ্রূণের আবিষ্কার শুধু বিজ্ঞানের নয়, এটি একটি সামাজিক এবং নৈতিক প্রশ্নও। জীবনের সংজ্ঞা কী? কীভাবে জীবন শুরু হয়? এই নতুন প্রযুক্তি কি ঈশ্বরসৃষ্ট জীবনের বিকল্প?
এমন প্রশ্ন এখন তীব্রভাবে সামনে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, “এই প্রযুক্তি মানব সভ্যতাকে এমন এক সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে, যেখান থেকে ফেরার পথ হয়তো আর থাকবে না। এখনই নিয়ন্ত্রণ না আনলে ভবিষ্যতে এই আবিষ্কার মানবজাতির জন্য হুমকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।”
বিজ্ঞানের এই নতুন আবিষ্কার নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ এবং সম্ভাবনাময়। কিন্তু এটি একইসঙ্গে নৈতিকতা, মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলার গভীর প্রশ্নও উত্থাপন করছে।
সিন্থেটিক ভ্রূণ ভবিষ্যতের চিকিৎসায় আশীর্বাদ না অভিশাপ—তা নির্ধারণ করবে এই প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ও সঠিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো।
আমরা কী শুধু বিজ্ঞানকে অন্ধভাবে অনুসরণ করবো, না কি তার সঙ্গে মানবতা ও নৈতিকতার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন সংযুক্ত করবো—সেটাই এখন সময়ের দাবি।
মন্তব্য