ঝিনাইদহ-৪ সংসদীয় আসনে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক সহিংসতা, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় গোটা এলাকায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় কেবল প্রার্থী বা তাঁদের কর্মী-সমর্থকরাই নন, সাধারণ ভোটার, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ থাকবে কি না—এ প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে।
সর্বশেষ শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নলডাঙ্গা বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী কাপ-পিরিচ প্রতীকের সাইফুল ইসলাম ফিরোজের নির্বাচনী অফিসে হামলার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একদল দুর্বৃত্ত হঠাৎ অফিসে ঢুকে চেয়ার-টেবিলসহ আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং সেখানে উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। এতে অন্তত ছয়জন আহত হন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ওয়াজ্জেদ হোসেন, তাঁর দুই ছেলে বাদশা ও আহাদ, খড়াশুনী গ্রামের রাজ্জাকের ছেলে শামীম এবং শ্রীমন্তপুর গ্রামের আয়নালের ছেলে জনি। তাঁদের স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনার আগেও কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক হামলার অভিযোগ উঠেছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে কালীগঞ্জ শহরের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর একটি নির্বাচনী অফিসে হামলা চালানো হয়। সেখানে টেবিল-চেয়ার ভাঙচুরের পাশাপাশি তিনটি মোটরসাইকেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনাস্থল থেকে ককটেল সদৃশ বস্তু উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একই রাতে পৌরসভার হেলাই গ্রামেও প্রায় আটজনের একটি সশস্ত্র দল আরেকটি নির্বাচনী অফিসে হামলা চালিয়ে দ্রুত মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। তার আগের দিন, ৪ ফেব্রুয়ারি কালীগঞ্জ উপজেলার পুকুরিয়া গ্রামে স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক সমর্থকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দুজন আহত হন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ভয়ভীতি, হুমকি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির ঘটনা বাড়ছে। অনেক ভোটার প্রকাশ্যে বলছেন, এমন পরিবেশে তাঁরা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ অভিযোগ করে বলেন, তাঁর কর্মী-সমর্থকরা ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চেষ্টা করছেন। তবে প্রশাসন দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সুষ্ঠু নির্বাচন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রাশেদ খান এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁর কোনো নেতাকর্মী বা সমর্থক এই সহিংসতার সঙ্গে জড়িত নন। বরং স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষ থেকেই পরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর ঘটিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষকে দায়ী করা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জেল্লাল হোসেন জানান, নলডাঙ্গার ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। দোষীদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
নির্বাচনী সহিংসতার সাম্প্রতিক চিত্র সংক্ষেপে নিচের ছকে তুলে ধরা হলো—
| তারিখ | স্থান | ঘটনার ধরন | আহত |
|---|---|---|---|
| ৭ ফেব্রুয়ারি | নলডাঙ্গা বাজার | নির্বাচনী অফিসে হামলা ও ভাঙচুর | ৬ |
| ৫ ফেব্রুয়ারি | নিশ্চিন্তপুর, কালীগঞ্জ | অফিসে হামলা, মোটরসাইকেল ভাঙচুর | ০ |
| ৫ ফেব্রুয়ারি | হেলাই গ্রাম | অফিসে হামলা, চেয়ার ভাঙচুর | ০ |
| ৪ ফেব্রুয়ারি | পুকুরিয়া গ্রাম | ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা | ২ |
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে এখনই কঠোর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রশাসন, প্রার্থী এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণই পারে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি শান্ত করে ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
