বিগত জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে যারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের আইনি সুরক্ষা ও স্বীকৃতি প্রদানের লক্ষ্যে ‘জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি আইন’ অনুমোদন করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, যারা জীবন বাজি রেখে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হয়রানিমূলক মামলা বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না।
আইনের মূল উদ্দেশ্য ও কর্মপরিকল্পনা
আইন উপদেষ্টা জানান, আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে যদি কারো বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা হয়ে থাকে, তবে সরকার তা আইনগত প্রক্রিয়ায় দ্রুত প্রত্যাহার করবে। শুধু তাই নয়, ওই বিশেষ সময়ের কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে কাউকেও নতুন কোনো মামলায় জড়ানো যাবে না। সরকার ইতিমধ্যে দেশব্যাপী খোঁজ নেওয়া শুরু করেছে যে, গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো রহস্যজনক বা ষড়যন্ত্রমূলক মামলা হয়েছে কি না। যদি এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা হবে।
সাংবিধানিক বৈধতা ও আন্তর্জাতিক নজির
অধ্যাপক আসিফ নজরুল এই দায়মুক্তি আইনের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। তার বক্তব্যের প্রধান দিকগুলো হলো:
সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ: বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে জাতীয় প্রয়োজনে বিশেষ দায়মুক্তি বা ‘ইনডেমনিটি’ আইন প্রণয়নের বিধান রয়েছে, যা এই অধ্যাদেশকে পূর্ণ বৈধতা দেয়।
বিপ্লবের স্বীকৃতি: যারা অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে দেশকে মুক্ত করেছেন, তাদের কর্মকাণ্ডকে আইনি নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ: বিশ্বের বিভিন্ন সফল গণবিপ্লবের পর বিপ্লবীদের সুরক্ষায় এ ধরনের আইন কার্যকর করার ইতিহাস রয়েছে, যা সমসাময়িকভাবেও স্বীকৃত।
প্রস্তাবিত এই আইনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে টেবিল আকারে দেওয়া হলো:
| বিষয়বস্তু | বিস্তারিত বিবরণ |
| আইনের লক্ষ্য | জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধাদের আইনি নিরাপত্তা প্রদান। |
| মামলা সংক্রান্ত বিধান | বিপ্লবকালীন কর্মকাণ্ডের জন্য মামলা প্রত্যাহার ও নতুন মামলা নিষিদ্ধ। |
| আইনি ভিত্তি | গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ। |
| আওতাধীন সময় | জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময়কাল। |
| উদ্দেশ্য | স্বৈরশাসন বিরোধী প্রতিরোধের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুরক্ষা। |
রাজনৈতিক প্রতিরোধের গুরুত্ব
আইন উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন যে, জুলাই যোদ্ধারা দেশকে একটি রুদ্ধশ্বাস শাসন ব্যবস্থা থেকে মুক্ত করতে অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আন্দোলনের সময় ঘাতক বাহিনীর হাত থেকে নিজেদের ও দেশবাসীকে রক্ষা করতে তারা যে ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, তা সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত। এই বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য তাদের দায়মুক্তি দেওয়া কেবল আইনি বিষয় নয়, বরং এটি তাদের ত্যাগের রাষ্ট্রীয় সম্মান।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশজুড়ে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন আন্দোলনের পটভূমিকে কেন্দ্র করে বিপ্লবীদের পুনরায় হেনস্তা করার সুযোগ না পায়।
