জয়-পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক হিসেবে আবির্ভূত ‘নীরব ভোটার’

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিগত তিনটি বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের পর এবারের ভোট কেবল নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক কঠিন পরীক্ষা। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১২টি জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে ‘গণভোট’। চব্বিশের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর ভোটের চিরাচরিত সমীকরণ ও হিসাব-নিকাশ আমূল বদলে গেছে। এবারের নির্বাচনী ময়দানে সবচেয়ে আলোচিত শক্তি এখন ‘নীরব ভোটার’, যারা কোনো দলের মিছিলে নেই, কিন্তু ব্যালটের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন।

ভোটার বিন্যাস ও সমীকরণের নতুন ভিত্তি

নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে ৫ কোটিরও বেশি তরুণ ভোটার (১৮-৩৭ বছর বয়সী), যারা এবার প্রথমবার বা দ্বিতীয়বার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এই বিশাল তরুণ গোষ্ঠী এবং প্রায় অর্ধেক নারী ভোটারের মন জয় করাই এখন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ।


ভোটার পরিসংখ্যান ও প্রভাব বিস্তারকারী গোষ্ঠীসমূহ

ভোটার শ্রেণীসংখ্যা/পরিসংখ্যান (আনুমানিক)রাজনৈতিক প্রভাব
মোট ভোটার১২,৭৭,১১,৮৯৫ জনসামগ্রিক নির্বাচনী ফলাফলের ভিত্তি
পুরুষ ভোটার৬,৪৮,২৫,১৫১ জনমাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতায় সক্রিয়
নারী ভোটার৬,২৮,৮৫,৫২৪ জননীরব সমর্থন ও তৃণমূলের নির্ণায়ক শক্তি
তরুণ ভোটার (১৮-৩৭)প্রায় ৫ কোটি (৪৪%)প্রধান ‘কিংমেকার’ ও পরিবর্তনের চালিকাশক্তি
সংখ্যালঘু ভোটার১ কোটির অধিকবিশেষ কিছু আসনে ৪০% পর্যন্ত প্রভাব

আওয়ামী লীগ সমর্থকদের অবস্থান ও নীরবতা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির। এবারের নির্বাচনে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। দলটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ পলাতক বা কারাবন্দি হওয়ায় তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা দিশেহারা। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভোট বর্জনের ডাক দেওয়া হলেও, স্থানীয় রাজনীতিতে দলটির যে নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক রয়েছে, তারা এখন সম্পূর্ণ ‘নীরব’। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল সংখ্যক সমর্থক যদি শেষ মুহূর্তে কেন্দ্রে গিয়ে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দেন, তবে তা জয়-পরাজয়ের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে দেবে। অনেক স্বতন্ত্র বা বিরোধী জোটের প্রার্থীরা গোপনে এই ‘বিপথগামী’ ভোটগুলো পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

তরুণ ও সংখ্যালঘু ভোটারের ভূমিকা

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সংশ্লিষ্টদের মতে, তরুণ ভোটাররা এবার রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, ক্লিন ইমেজ এবং এলাকার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। যেহেতু বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি-র মতো দলগুলোর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তাই ভোটের ব্যবধান খুব সামান্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ ক্ষেত্রে তরুণদের ‘সুইং ভোট’ জয়ী প্রার্থী নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

অন্যদিকে, দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট অনেক আসনেই চূড়ান্ত ফলাফল বদলে দিতে সক্ষম। বিশেষ করে সীমান্তসংলগ্ন জেলাগুলোতে সংখ্যালঘু ভোটাররা নিজেদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে পারে এমন প্রার্থীকেই বেছে নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উপসংহার

প্রকাশ্যে মিছিল-মিটিংয়ে না থাকা এই কোটি কোটি নীরব ভোটাররা মূলত বুথের ভেতরে গোপন সিলের মাধ্যমেই তাঁদের সিদ্ধান্ত জানাবেন। নারী, তরুণ, সংখ্যালঘু এবং অস্তিত্ব সংকটে থাকা রাজনৈতিক কর্মীদের এই সম্মিলিত নীরব ভোটই নির্ধারণ করবে ২০২৬ সালের পরবর্তী সংসদ ও সরকার কার হাতে থাকবে। প্রার্থীরাও তাই শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় জনসভার চেয়ে ব্যক্তিগত সংযোগ ও নীরব ভোটারদের মন জয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।