চীনা খনিজ সম্পদের প্রভাব ও আধিপত্য মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে অপরিহার্য খনিজের নিরাপদ ও স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগকে ইইউ নীতিনির্ধারকেরা সময়োপযোগী ও কৌশলগত বলে মনে করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
ইইউ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে উভয় পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করতে পারে। এই সমঝোতার মূল লক্ষ্য হবে আধুনিক প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যান, প্রতিরক্ষা শিল্প ও চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো। পাশাপাশি যৌথভাবে নতুন ও বিকল্প উৎস অনুসন্ধান, খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বর্তমানে বিরল পৃথিবী উপাদান (রেয়ার আর্থ), লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল ও গ্রাফাইটের মতো কৌশলগত খনিজে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ—উভয়ই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় চীনের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বেইজিং কার্যত একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের সময় চীন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা বিধিনিষেধ আরোপ করলে পশ্চিমা দেশগুলোর শিল্প ও প্রযুক্তিখাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রকে যৌথ খনিজ প্রকল্প, বিনিয়োগ কাঠামো এবং ন্যায্য মূল্য ব্যবস্থার সম্ভাবনা যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও স্বচ্ছ, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ করার ওপর জোর দেওয়া হবে। এতে অংশীদার দেশগুলোর কৌশলগত অঞ্চল, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখার বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও বিরল খনিজের উৎস ঘিরে ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়। তার পরপরই ইইউ–যুক্তরাষ্ট্র খনিজ অংশীদারত্বের প্রস্তাব সামনে আসায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার একাধিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যার মূল আলোচ্য বিষয়ও চীনা খনিজের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বিকল্প সরবরাহ কাঠামো গড়ে তোলা। ইইউ আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই কৌশলগত অংশীদারত্ব ভবিষ্যতে অন্য মিত্র দেশগুলোকেও একই উদ্যোগে যুক্ত করতে সহায়ক হবে।
নিচের টেবিলে কৌশলগত খনিজে বর্তমান নির্ভরতা ও সম্ভাব্য উদ্যোগের একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
| খনিজের নাম | প্রধান ব্যবহার ক্ষেত্র | বর্তমান নির্ভরতা | প্রস্তাবিত উদ্যোগ |
|---|---|---|---|
| বিরল পৃথিবী উপাদান | চিপ, প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক্স | চীনের ওপর বেশি | যৌথ খনন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ |
| লিথিয়াম | বৈদ্যুতিক যান, ব্যাটারি | চীন ও সীমিত উৎস | বিকল্প দেশ থেকে সংগ্রহ |
| কোবাল্ট | ব্যাটারি প্রযুক্তি | চীন-নিয়ন্ত্রিত বাজার | নৈতিক ও নিরাপদ সরবরাহ |
| নিকেল | শিল্প ও শক্তি খাত | আংশিক নির্ভরতা | বিনিয়োগ ও মজুত বৃদ্ধি |
সব মিলিয়ে, ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য এই অংশীদারত্ব বৈশ্বিক খনিজ বাজারে ভারসাম্য ফেরাতে এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।