,

চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রে নিখোঁজ শিশু, ২৪ ঘণ্টাতেও মেলেনি সন্ধান

কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদে গোসল করতে নেমে রাইসা মনি নামে আট বছর বয়সী এক শিশু নিখোঁজ হয়েছে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের যৌথ ও ব্যাপক তল্লাশির মাধ্যমে তার কোনো সন্ধান বা অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। শনিবার বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের কাঁচকোল এলাকায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত নিখোঁজের ঘটনাটি ঘটে। নিখোঁজ রাইসা মনি ওই কাঁচকোল এলাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলামের মেয়ে। সে স্থানীয় কাঁচকোল বাজার নূরানি মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির একজন নিয়মিত ছাত্রী ছিল। ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী অংশে বছরের এই সময়ে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্রোতের তীব্রতা বেশি থাকে, যা উদ্ধার কার্যক্রমে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

ঘটনার বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শী শিশুর বক্তব্য

স্থানীয় এলাকাবাসী ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শনিবার বিকেলের দিকে রাইসা মনি তার বাড়ির পাশে কয়েকজন সমবয়সী শিশুর সাথে ব্রহ্মপুত্র নদে গোসল করার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। নদে নেমে গোসল করার একপর্যায়ে অসাবধানতাবশত সে নদীর কিনারা বা পাড় থেকে কিছুটা গভীর পানির দিকে চলে যায়। সেখানে নদীর তীব্র স্রোত ও ঘূর্ণাবর্তের কারণে সে হঠাৎ পানির নিচে তলিয়ে যেতে শুরু করে। কুড়িগ্রাম অঞ্চলের নদীগুলোতে বর্ষা ও প্রাক-বর্ষা মৌসুমে পানির গভীরতা দ্রুত পরিবর্তিত হয় এবং তলদেশে বালু সরে গিয়ে চোরাবালির মতো গর্তের সৃষ্টি হয়, যা অসাবধানতাবশত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

রাইসার সাথে গোসল করতে যাওয়া শিশু আফসানা খাতুন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জানায়, রাইসা মনি যখন পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা সমবয়সী সবাই মিলে তাকে টেনে তোলার এবং বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নদীর স্রোত অত্যন্ত বেশি থাকায় মুহূর্তের মধ্যেই সে সবার চোখের সামনে সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং নিখোঁজ হয়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। রাইসা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার পর সঙ্গে থাকা শিশুরা দ্রুত নদী থেকে উঠে এসে বিষয়টি স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের পরিবারকে অবহিত করে। খবর পাওয়ার পর স্থানীয় লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার কাজে নেমে পড়েন এবং রাতভর নদের বিভিন্ন অংশে নৌকা ও জাল ব্যবহার করে খোঁজাখুঁজি অব্যাহত রাখেন।

ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দলের উদ্ধার অভিযান

শিশু নিখোঁজের সংবাদটি চিলমারী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনকে জানানো হলে ফায়ার সার্ভিসের একটি উদ্ধারকারী দল দ্রুত কাঁচকোল এলাকার দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং প্রাথমিক উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তবে উপজেলা পর্যায়ে নিখোঁজ বা ডুবন্ত মানুষকে উদ্ধারের জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ ডুবুরি ও বিশেষায়িত আধুনিক সরঞ্জাম না থাকায় উদ্ধার কার্যক্রমে তীব্র বেগ পেতে হয়। কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারীসহ কয়েকটি উপজেলা নদীবেষ্টিত ও বন্যাপ্রবণ হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস স্টেশনগুলোতে স্থায়ী ডুবুরি দল না থাকা একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। পরবর্তীতে উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে চিলমারী ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ে যোগাযোগ করে ডুবুরি দলের সহায়তা চাওয়া হয়।

এরই প্রেক্ষিতে, সোমবার দুপুরে রংপুর থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি বিশেষ ও দক্ষ ডুবুরি দল চিলমারীর ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায় এবং স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সাথে যৌথ উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয়। রংপুর থেকে আসা ডুবুরি দলের সদস্যরা ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র স্রোত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই নদের তলদেশে কয়েক দফায় অত্যন্ত নিখুঁত ও নিবিড় অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তবে দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালানোর পরও নিখোঁজ শিশু রাইসা মনির কোনো সন্ধান বা মরদেহের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি

চিলমারী ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা গুলজার হোসেন মণ্ডল উদ্ধার অভিযানের সার্বিক অগ্রগতি ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি জানান, সোমবার দুপুর পর্যন্ত রংপুর থেকে আগত বিশেষ ডুবুরি দল নদের বিভিন্ন পয়েন্টে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, উদ্ধারকারী ডুবুরি দল ব্রহ্মপুত্র নদের তলদেশের প্রায় ১৫০ মিটার গভীর পর্যন্ত নেমে নিখোঁজ শিশুটির অবস্থান শনাক্ত করার জন্য অনুসন্ধান চালিয়েছে। কিন্তু নদে অত্যন্ত তীব্র স্রোত এবং পানির ঘোলাটে অবস্থার কারণে পানির নিচে দৃশ্যমানতা কম থাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রমে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তার ধারণা অনুযায়ী, নিখোঁজ শিশুটির মরদেহ দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার কারণে এবং নদের তীব্র স্রোতের টানে দুর্ঘটনাস্থল থেকে ভেসে বহু দূরে বা ভাটির দিকে অন্য কোনো স্থানে চলে যেতে পারে। তবে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে উদ্ধার অভিযান এখনো পুরোপুরি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের সহায়তায় নদের ভাটি অঞ্চলের এলাকাগুলোতে এবং পার্শ্ববর্তী নদীপথের বিভিন্ন পয়েন্টে নজরদারি ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।