চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার জোয়ারা ইউনিয়নের উত্তর জোয়ারা গ্রামের ১৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ ফাহাদের জীবনের গল্পটি এখন এক করুণ বাস্তবতা—বিদেশে চাকরির আশায় পাড়ি দেওয়া এক তরুণের লাশ হয়ে ফিরে আসা। পরিবারের স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং সংগ্রামের মধ্যেই নির্মমভাবে থেমে গেল তাঁর জীবনযাত্রা।
গত ৩০ জানুয়ারি ঢাকা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন ফাহাদ। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে তাঁর ইথিওপিয়া পৌঁছানোর কথা ছিল, সেখান থেকে বিমানে জিম্বাবুয়ে হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঘটে ভিন্ন কিছু। দালালচক্র তাঁকে ইথিওপিয়া থেকে বিমানে না পাঠিয়ে জঙ্গলের বিপজ্জনক পথ ধরে জিম্বাবুয়ে নিয়ে যায়। এরপর সড়কপথে দীর্ঘ কষ্টকর যাত্রা শেষে ১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান।
সেদিন সকালেই ছেলের গন্তব্যে পৌঁছানোর খবর পান তাঁর বাবা নুর মোহাম্মদ (৪৫)। কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। একই দিন রাতেই আরেকটি ফোনে আসে মৃত্যুসংবাদ। শোকাহত বাবা বলেন, “চাকরির আশায় গিয়েছিল, কিন্তু ফিরল লাশ হয়ে। ওরা আমার ছেলেকে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলল।”
পরিবারের ধারণা, দীর্ঘ পথযাত্রা, অনাহার, অসুস্থতা এবং চিকিৎসার অভাবেই ফাহাদের মৃত্যু হয়েছে। যাত্রার শুরুতে তাঁকে ২০০ মার্কিন ডলার এবং পর্যাপ্ত শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে দালালচক্র তাঁর সবকিছু ছিনিয়ে নেয়। ফলে তিনি চরম কষ্টের মধ্যে পড়েন।
ফাহাদের যাত্রাপথের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
| ধাপ | স্থান | যাতায়াতের মাধ্যম | পরিস্থিতি |
|---|---|---|---|
| ১ | ঢাকা → ইথিওপিয়া | বিমান | পরিকল্পনা অনুযায়ী যাত্রা শুরু |
| ২ | ইথিওপিয়া → জিম্বাবুয়ে | জঙ্গলের পথ | দালালদের মাধ্যমে বিপজ্জনক যাত্রা |
| ৩ | জিম্বাবুয়ে → দক্ষিণ আফ্রিকা | সড়কপথ | দীর্ঘ কষ্টকর ভ্রমণ |
| ৪ | দক্ষিণ আফ্রিকা পৌঁছানো | — | পৌঁছানোর দিনেই মৃত্যু |
ফাহাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন দক্ষিণ আফ্রিকার মুসিনা শহরের প্রবাসী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শামীম। তিনি সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে একটি ঘরে ফাহাদের মরদেহ দেখতে পান এবং পাসপোর্ট ও কাগজপত্র দেখে পরিচয় নিশ্চিত করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর এই উদ্যোগে অবশেষে লাশ দেশে আনা সম্ভব হয়।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে ফাহাদের মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়। সকাল ১০টায় স্থানীয় জামে মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাঁকে। জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন, যা এলাকার মানুষের গভীর শোক ও সহমর্মিতার বহিঃপ্রকাশ।
ছেলের কবর জিয়ারত শেষে নুর মোহাম্মদ ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলে আর নেই। শামীম ভাই না থাকলে হয়তো ছেলের লাশটাও পেতাম না। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ।”
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, বিদেশে চাকরির লোভ দেখিয়ে দালালচক্র কীভাবে তরুণদের জীবন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা বন্ধ করা কঠিন।
