খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই আগস্ট ২০২৬, ৩:১ পিএম

চট্টগ্রাম নগরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মিনিবাস, মাইক্রোবাসসহ গ্যাসনির্ভর যানবাহনের চালকদের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। যাত্রী নিয়ে সড়কে ছুটে বেড়ানোর বদলে দিনের বড় একটি সময় এখন তাঁদের কাটছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইনে। ভোরে গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে গ্যাস নিতে পারছেন না। এতে একদিকে যেমন তাঁদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে দৈনিক আয়। অথচ গাড়ির মালিককে জমা দেওয়া, জ্বালানি, খাবার ও পরিবারের খরচ—কোনোটিই কমছে না।
সাধারণত একজন সিএনজিচালিত যানবাহনের চালক প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা রাস্তায় থাকেন। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই সময়ের মধ্যেই যাত্রী পরিবহন করে তাঁরা দৈনিক আয় করেন। কিন্তু গ্যাস নিতে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলে কর্মদিবসের প্রায় অর্ধেক সময়ই চলে যায় ফিলিং স্টেশনে। ফলে আয় কমে যায়, আর একই সঙ্গে নগরের গণপরিবহন ব্যবস্থায়ও তৈরি হয় বাড়তি চাপ।
মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে নগরের আকবরশাহ এলাকার পাহাড়িকা সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা যায় দীর্ঘ সারি। অটোরিকশা নিয়ে সেখানে অপেক্ষা করছিলেন চালক আবু তৈয়ব। তিনি জানান, ভোর চারটা থেকেই গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তখনও তাঁর গাড়িতে গ্যাস নেওয়ার সুযোগ আসেনি। আগের রাতটিও গাড়ির ভেতর কাটিয়েছেন তিনি। সকালে একটি হোটেলে নাশতা করেছেন, কিন্তু দিন শেষে যে আয় হবে, তা দিয়ে সেই অতিরিক্ত খরচটুকু সামলাতে পারবেন কি না—এ নিয়েও তাঁর অনিশ্চয়তা রয়েছে।
আবু তৈয়ব একা নন। নগরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে একই চিত্র দেখা গেছে। পাহাড়িকা ও ষোলশহরের ফসিলসহ কয়েকটি স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে ছিল অটোরিকশা ও অন্যান্য গ্যাসচালিত যান। কোনো চালক চার ঘণ্টা, কেউ পাঁচ ঘণ্টা, আবার কেউ ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন। অনেকের অভিযোগ, দীর্ঘ অপেক্ষার পর গ্যাস পেলেও আগের তুলনায় চাহিদামতো গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার তাঁদের ফিলিং স্টেশনের লাইনে ফিরতে হচ্ছে।
পাহাড়িকা ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ মোহাম্মদ আবুল কাশেমের অভিজ্ঞতাও একই। তাঁর ভাষ্য, আগের দিন প্রায় আট ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিতে হয়েছিল। এরপর মাত্র দুই ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পরই গ্যাস শেষ হয়ে যায়। পরদিন আবার ভোর ছয়টা থেকে তাঁকে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। কখন গ্যাস পাবেন, তা নিশ্চিত না হওয়ায় পুরো দিনের কাজের পরিকল্পনাও করতে পারছেন না তিনি।
ফসিল ফিলিং স্টেশনের সামনে থাকা চালকেরা জানান, স্বাভাবিক সময়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই গ্যাস নিয়ে তাঁরা রাস্তায় ফিরতে পারতেন। এখন সেই অপেক্ষা কয়েক ঘণ্টায় গড়িয়েছে। ফলে যাত্রী পরিবহনের জন্য কার্যকর সময় কমে যাচ্ছে এবং দৈনিক আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম-ফতেয়াবাদ রুটে চলাচলকারী একটি মিনিবাসের চালক মো. নাহিদের গত দুই দিনের আয় পরিস্থিতির চিত্রটি আরও স্পষ্ট করে। স্বাভাবিক সময়ে দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় হলেও আগের দিন মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে তাঁকে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় গ্যাসের লাইনে আটকে থাকায় পরদিনও আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন দৈনিক জমায় গাড়ি চালানো শ্রমজীবী মানুষেরা। প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা মালিককে জমা দিতে হয় তাঁদের। এরপর থাকে খাবার, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়। আয় কমলেও এসব ব্যয় একই জায়গায় রয়েছে। ফলে অনেক চালককে ধার করে সংসার চালাতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও বেশি সময় গাড়ি চালানোর চেষ্টা করছেন।
দীর্ঘস্থায়ী সংকটের আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাব পড়তে পারে যাত্রীদের ওপর। রাস্তায় চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা কমে গেলে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় বাড়ে এবং ব্যস্ত সময়ে পরিবহন সংকট আরও তীব্র হতে পারে। কোথাও কোথাও চালকদের বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে বেশি ভাড়া নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হলে তার চাপও শেষ পর্যন্ত সাধারণ যাত্রীদের ওপর পড়তে পারে।
পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই পরিস্থিতি কেবল চালকদের ব্যক্তিগত আয়-রোজগারের সংকট নয়; এটি নগরের সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলছে। দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনেক যানবাহন ফিলিং স্টেশনের লাইনে আটকে থাকায় রাস্তায় কার্যকর যানবাহনের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এতে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগছে এবং গণপরিবহনে চাপ বাড়ছে।
চট্টগ্রামের চলমান গ্যাস সংকটের পেছনে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ২১ জুলাই একসিলারেট এনার্জি পরিচালিত ওই টার্মিনালে আগুন লাগার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায়। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত সংকট দ্রুত কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি বা কেজিডিসিএল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় গ্রিড থেকে ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে। অথচ চট্টগ্রাম অঞ্চলে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১৬ কোটি ঘনফুট। আগের ২৪ ঘণ্টাতেও একই পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গিয়েছিল।
স্বাভাবিক সময়ে কেজিডিসিএলের সরবরাহ করা গ্যাসের বড় অংশ ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি খাতে। দৈনিক চাহিদার হিসাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ১৫ কোটি ঘনফুট, শিল্পকারখানায় প্রায় ৯ কোটি ঘনফুট, আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রায় ৬ কোটি ঘনফুট এবং সিএনজি খাতে প্রায় ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। বর্তমান ঘাটতির কারণে এসব খাতের কোনো একটিতেই পূর্ণ চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
কেজিডিসিএলের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় পেট্রোবাংলার বরাদ্দ অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে গ্যাস বিতরণ করতে হচ্ছে। ফলে একই সময়ে সব খাতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল সচল করার জন্য মেরামতের কাজ চলছে এবং বিশেষজ্ঞদের একটি দল পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, চলতি সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে পারে। তবে তত দিন পর্যন্ত চট্টগ্রামের সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকদের দুর্ভোগ কতটা কমবে, তা নির্ভর করছে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির ওপর।
কারণ একজন চালকের জন্য ফিলিং স্টেশনে অতিরিক্ত এক ঘণ্টা অপেক্ষা মানেই শুধু সময় নষ্ট নয়। সেই এক ঘণ্টা মানে কম যাত্রী, কম ভাড়া, কম আয়। আর যাঁদের সংসার প্রতিদিনের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের কাছে কয়েক ঘণ্টার এই অপেক্ষা সরাসরি পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতাকে সংকটে ফেলছে। গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই দুর্ভোগ শুধু চালকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব চট্টগ্রামের যাত্রী, পরিবহনব্যবস্থা এবং নগরজীবনের ওপরও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য