জামালপুরের তারাকান্দিতে অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পপ্রতিষ্ঠান যমুনা সার কারখানায় ফের ইউরিয়া সার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার কারণে মাত্র কয়েক দিন চালু থাকার পর আবারও স্থবিরতা নেমে এসেছে এই গুরুত্বপূর্ণ কারখানায়। এর ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলের সার সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৃষকদের মাঝে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রোববার সকাল থেকে কারখানার ইউরিয়া উৎপাদন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর আগে কারখানার বিভিন্ন ত্রুটি ও বয়লারের সমস্যা মেরামত করে দীর্ঘ পনেরো দিন বন্ধ থাকার পর গত ২৩ অক্টোবর সবেমাত্র উৎপাদনে ফিরেছিল কারখানাটি। কিন্তু স্থায়ীভাবে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব হয়নি।
কারখানার ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছে যে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আগামী ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই অচলাবস্থা চলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে কারখানাটি বন্ধ থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে জামালপুর জেলার তারাকান্দিতে যমুনা সার কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুর দিকে এই কারখানার দৈনিক ইউরিয়া উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় এর উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে ১ হাজার ৩০০ মেট্রিক টনে নেমে আসে। গত বছরের জুনের দিকে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিলে ২১ জুন যমুনা সার কারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস বন্ধ থাকার পর গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলে ওই বছরের ১৮ ডিসেম্বর কারখানাটি পুনরায় উৎপাদনে ফিরেছিল।
তবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কারখানার উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। ভারতীয় বিশেষজ্ঞ তানাজি এস পন্দেকারের নেতৃত্বে একটি কারিগরি দল কারখানার অ্যামোনিয়া প্লান্টের এনজি বুস্টার কমপ্রেসার পরিদর্শনে আসে। সেই পরিদর্শনের সময় ভুলবশত একটি বাটনে চাপ পড়ায় বিকট শব্দে অ্যামোনিয়া প্লান্ট বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে সে সময় ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া উৎপাদন পুরোপুরি থমকে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েক দিন প্রকৌশলীদের নিরলস প্রচেষ্টার পর উৎপাদন শুরু হলেও সম্প্রতি কারখানার রিফরমার টিউবে লিকেজ দেখা দেওয়ায় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে আবারও উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।
যমুনা সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকার বিষয়টি দেশের কৃষি খাতের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইলসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় ১৯টি জেলার কৃষকদের সার চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে এই কারখানার ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। ভরা মৌসুমে উৎপাদন এভাবে দীর্ঘস্থায়ীভাবে বন্ধ থাকলে স্থানীয় বাজারে ইউরিয়া সারের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয় কৃষকরা সময়মতো পর্যাপ্ত সার না পেলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করতে তখন বিদেশ থেকে অতিরিক্ত চড়া মূল্যে ইউরিয়া সার আমদানি করতে হয় সরকারকে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ও আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের নীতিনির্ধারক মহল দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে কারখানাটি চালুর উদ্যোগ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন এলাকার কৃষক ও ব্যবসায়ী মহল।








