খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই আগস্ট ২০২৫, ৪:৩১ পিএম

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাজা শহর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য সামরিক বাহিনীকে অনুমোদন দিয়েছে। শুক্রবার এই খবর প্রকাশের পর দেশ-বিদেশ থেকে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
জেরুজালেম থেকে এএফপি এই সংবাদ জানিয়েছে।
গাজা যুদ্ধে দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও, যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার জন্য নেতানিয়াহুর ওপর চাপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে দুই কোটি অধিক ফিলিস্তিনি দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পাবে এবং ইসরায়েলি বন্দি মুক্তির ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের সহযোগিতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রতিপক্ষ সশস্ত্র সংগঠন হামাস এই পরিকল্পনাকে ‘নতুন যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং তীব্র সমালোচনা করেছে।
ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র জার্মানি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কারণ তারা আশঙ্কা করছে এসব অস্ত্র গাজায় ব্যবহৃত হতে পারে। জার্মানির এই পদক্ষেপকে নেতানিয়াহু ‘হামাসকে পুরস্কৃত করার মতো’ বলেও সমালোচনা করেছেন।
নেতানিয়াহুর দপ্তর জানিয়েছে, নতুন অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সেনারা গাজা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেবে।
নেতানিয়াহু এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছেন, “আমরা গাজা দখল করব না, বরং গাজাকে হামাসের দমন থেকে মুক্ত করব।”
তিনি আরও বলেন, গাজায় নিরস্ত্রীকরণ এবং শান্তিপূর্ণ বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বন্দিদের মুক্তি সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যৎ হামলার ঝুঁকি কমবে।
১৯৬৭ সালে ইসরায়েল গাজা দখল করেছিল, তবে ২০০৫ সালে সৈন্য ও বসতিপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেয়।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, মন্ত্রিসভা পাঁচটি নীতি গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে গাজার নিরস্ত্রীকরণ এবং একটি বিকল্প বেসামরিক প্রশাসন গঠন, যা হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বাইরে থাকবে।
বিশ্বজুড়ে এই পরিকল্পনা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। চীন, তুরস্ক, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি আরব দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এটিকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ বলে অভিহিত করে সতর্ক করেছেন যে, এই পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই দুর্ভাগ্যপূর্ণ অবস্থায় থাকা লক্ষাধিক ফিলিস্তিনির জীবন আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রোববার এ বিষয়ে জরুরি বৈঠক করবে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে বলেন, নতুন পরিকল্পনা বৈধ লক্ষ্য অর্জনে কীভাবে সহায়ক হবে তা বোঝা কঠিন।
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া মিশ্র; প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানান, সেনারা ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু করেছে।
অন্যদিকে, জিম্মিদের পরিবারের সংগঠন ‘হোস্টেজ অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিজ ফোরাম’ এই পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি জিম্মিদের ‘পরিত্যাগ’ করার সমতুল্য। সংগঠনটির ভাষ্য, ‘গত রাতে মন্ত্রিসভা এমন বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা জিম্মি, সৈন্য এবং পুরো ইসরায়েলি সমাজের জন্য বিপদ ডেকে আনবে।’
২০২৩ সালের হামলায় বন্দি হওয়া ২৫১ জনের মধ্যে এখনও ৪৯ জন গাজায় বন্দি রয়েছে, যাদের মধ্যে ২৭ জনকে মৃত বলে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, যদি ইসরায়েলি হামলা বাড়ে, তাহলে সেনারা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অভিযান চালাতে পারে যেখানে বন্দিদের রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
কিছু ইসরায়েলি নাগরিক এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। ইহুদিদের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ছাত্র চেইম ক্লেইন (২৬) বলেছেন, “গাজা নিয়ন্ত্রণে নিলে হামাসকে পুরোপুরি না হলেও বড় অংশে নির্মূল করা সম্ভব হবে।”
গত মাসে ইসরায়েলি সেনারা জানিয়েছিল, তারা গাজা উপত্যকার ৭৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।
গাজার বাসিন্দারা নতুন ধরণের বাস্তুচ্যুতি ও হামলার ভয়ে আতঙ্কিত। ছয় সন্তানের মা মাইসা আল-শান্তি (৫২) এএফপিকে বলেন, “তারা আমাদের বারবার দক্ষিণে যেতে বলে, আবার উত্তরে পাঠায়। আমরা মানুষ, কিন্তু কেউ আমাদের কথা শুনছে না বা দেখছে না।”
হামাস শুক্রবার বলেছে, গাজা দখল ও বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়ার এই পরিকল্পনাটি ‘নতুন যুদ্ধাপরাধ’। তারা সতর্ক করেছে, এতে বন্দিদের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে এবং ইসরায়েলকে চরম মূল্য দিতে হবে।
জাতিসংঘের এক সমর্থিত জরিপে সতর্ক করা হয়েছে, গাজায় দুর্ভিক্ষের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, চলতি বছরে গাজায় অপুষ্টিতে অন্তত ৯৯ জন মারা গেছে, তবে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে।
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, বিমান থেকে ত্রাণ ফেলার সময় ১৯ বছর বয়সী এক যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন। তিনি জানান, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভারি ত্রাণের প্যাকেট পড়ে প্রতিদিনই মানুষ আহত ও নিহত হচ্ছে। এছাড়া, ত্রাণ ফেলার স্থানে ভিড় ও পদদলিত হওয়ার কারণে প্রায়ই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
বাসাল আরও জানান, শুক্রবার গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন।
যদিও ইসরায়েল সম্প্রতি গাজায় কিছু পরিমাণ ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে, জাতিসংঘ বলছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যে, ইসরায়েলি অভিযানে এপর্যন্ত ৬১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ২০২৩ সালে হামাসের হামলায় ইসরায়েলে নিহত হয়েছে ১,২১৯ জন। সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে এএফপি এই হিসাব দিয়েছে।
মন্তব্য