ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি ট্যাংকের গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলায় ছয় শিশুসহ অন্তত ২৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। বুধবার (৪ জানুয়ারি) গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা হতাহতের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নতুন করে শুরু হওয়া এই সহিংসতায় গাজাবাসীর মধ্যে আবারও চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরে চালানো একাধিক হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। একটি হামলার পর আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসা দিতে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এক চিকিৎসক। তবে প্রথম হামলার কিছুক্ষণ পর একই এলাকায় দ্বিতীয় দফা আঘাত হানা হলে তিনিও নিহত হন। স্থানীয় চিকিৎসক ও উদ্ধারকর্মীরা জানান, একের পর এক হামলার কারণে আহতদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং জরুরি চিকিৎসা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এ ছাড়া উত্তর গাজার গাজা সিটিতেও পৃথক হামলার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে পাঁচ মাস বয়সি এক শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। শিশুটির পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, গোলাবর্ষণের সময় তারা ঘরের ভেতর অবস্থান করছিলেন এবং পালানোর কোনো সুযোগ পাননি।
নিহত পরিবারের একজন সদস্য আবু মোহাম্মদ হাবুশ বলেন, “আমরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ ট্যাংক থেকে গোলা ছোড়া হয়, যা সরাসরি আমাদের ঘরে এসে পড়ে। আমার সন্তান, আমার ভাইয়ের সন্তানরা শহীদ হয়েছে। আমরা কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নই। আমরা সাধারণ, শান্তিপূর্ণ মানুষ।” তার এই বক্তব্য গাজাবাসীর দীর্ঘদিনের বেসামরিক দুর্ভোগের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হামাস অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘন করে নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে অবস্থানরত ইসরাইলি সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এর জবাবে তারা পাল্টা হামলা চালাতে বাধ্য হয়। সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে, ওই ঘটনায় একজন ইসরাইলি সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে হামাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসরাইলের এই ধরনের হামলা চলমান যুদ্ধবিরতি স্থিতিশীল করার উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সংগঠনটি সহিংসতা বন্ধে তাৎক্ষণিক আন্তর্জাতিক চাপ ও মধ্যস্থতার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য বড় হুমকি।
উল্লেখ্য, জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দেন। এই ধাপে গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, পুনর্গঠন পরিকল্পনা এবং মানবিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। তবে গাজার ৫০ শতাংশের বেশি এলাকা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ফলে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও সহিংসতার ঝুঁকি কমেনি।
গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ইসরাইলি গুলিতে অন্তত ৫৩০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। একই সময়ে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের হামলায় চারজন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন। চলমান এই সংঘাত গাজার মানবিক পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলছে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে জটিল করে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সহিংসতার সংক্ষিপ্ত চিত্র
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নিহত ফিলিস্তিনি | অন্তত ২৩ জন |
| নিহত শিশুর সংখ্যা | ৬ জন |
| প্রধান হামলার এলাকা | খান ইউনিস, গাজা সিটি |
| যুদ্ধবিরতির পর মোট নিহত | অন্তত ৫৩০ জন ফিলিস্তিনি |
| ইসরাইলি সেনা নিহত | ৪ জন |
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহল গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং কার্যকর যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের দাবি জোরালোভাবে তুলছে।
