বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর জয়যাত্রা যে গতিতে এগিয়ে চলছে, তা একাধারে বিস্ময়কর এবং কৌতূহলোদ্দীপক। তবে এআই কেবল তথ্য বিন্যাস করবে নাকি মানুষের মতো মৌলিক চিন্তায় সক্ষম হবে—এই বিতর্ক এখন তুঙ্গে। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ‘গ্যালিলিও টেস্ট’। সম্প্রতি প্রযুক্তি দুনিয়ার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং স্পেসএক্স ও এক্সএআই-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক এই পরীক্ষার গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছেন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি ভিডিও শেয়ার করে তিনি জানান, একটি আদর্শ এআই সিস্টেমের এমন সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন যা অপ্রিয় হলেও ধ্রুব সত্য প্রকাশ করতে পারে।
Table of Contents
গ্যালিলিও টেস্টের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
এই পরীক্ষার নামকরণ করা হয়েছে সপ্তদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ইতালীয় বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি-র নামানুসারে। সেই যুগে প্রচলিত বিশ্বাস ছিল যে, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত। কিন্তু গ্যালিলিও গ্যালিলি বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, পৃথিবী নয় বরং সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্রে এবং পৃথিবী তার চারদিকে আবর্তন করছে। তৎকালীন সমাজ ও গির্জার কাছে এই সত্য ছিল চরম অজনপ্রিয় এবং বিতর্কিত। সত্য প্রকাশ করার অপরাধে তাঁকে কারাবরণ ও গৃহবন্দী হতে হয়েছিল, তবুও তিনি তাঁর বৈজ্ঞানিক সত্য থেকে বিচ্যুত হননি। গ্যালিলিও টেস্ট মূলত সেই আপসহীন সত্যনিষ্ঠা এবং মৌলিক চিন্তারই একটি আধুনিক মানদণ্ড।
এআই-এর জন্য গ্যালিলিও টেস্ট কী?
গ্যালিলিও টেস্ট এমন একটি পরিমাপক, যা বিচার করবে একটি এআই সিস্টেম কেবল ডেটাসেটের ওপর ভিত্তি করে উত্তর দেয়, নাকি এটি কোনো অজানাকে জানার ক্ষমতা রাখে। বর্তমানে প্রচলিত এআই মডেলগুলো (যেমন চ্যাটজিপিটি বা জেমিনি) মূলত ইন্টারনেটে থাকা বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে আমাদের উত্তর প্রদান করে। তারা বিদ্যমান তথ্যের পুনর্গঠন করে মাত্র, কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা মৌলিক ধারণা জন্ম দিতে পারে না। গ্যালিলিও টেস্টে উত্তীর্ণ হতে হলে এআই-কে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে এমন কিছু উদ্ভাবন করতে হবে যা আগে কখনো মানুষ চিন্তা করেনি।
গ্যালিলিও টেস্টে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রধান শর্তাবলি
| শর্তের নাম | বিস্তারিত বিবরণ |
| মৌলিক উদ্ভাবন | এআই-কে এমন নতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দিতে হবে যা বিদ্যমান জ্ঞানের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। |
| যৌক্তিক প্রমাণ | প্রস্তাবিত ধারণার পেছনে অকাট্য গাণিতিক ও তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা থাকতে হবে। |
| অদম্য সত্যবাদিতা | রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে অজনপ্রিয় হলেও সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্যটি প্রকাশ করতে হবে। |
| যাচাইযোগ্যতা | এআই-এর দেওয়া তত্ত্বটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অন্য বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরীক্ষা করার যোগ্য হতে হবে। |
সত্য অনুসন্ধান ও ইলন মাস্কের দর্শন
ইলন মাস্কের মতে, বর্তমানের অনেক এআই মডেলকে ‘পলিটিক্যালি কারেক্ট’ বা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য উত্তর দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর ফলে অনেক সময় প্রকৃত সত্য আড়ালে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। মাস্ক মনে করেন, এআই যদি কোনো পক্ষপাতদুষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা মানবসভ্যতার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। গ্যালিলিও টেস্টের মূল উদ্দেশ্য হলো এআই-কে এমনভাবে গড়ে তোলা যেন তা গ্যালিলিওর মতোই অটল থেকে কেবল ধ্রুব সত্য প্রকাশ করতে পারে, তা সে সত্য যতই তিক্ত হোক না কেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
গ্যালিলিও টেস্টে উত্তীর্ণ হওয়া এআই-এর জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কারণ সৃজনশীলতা এবং অন্তর্দৃষ্টি কেবল ডেটা প্রসেসিংয়ের ওপর নির্ভর করে না; এর জন্য প্রয়োজন বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতা এবং বিদ্যমান জ্ঞানের শূন্যস্থানগুলো চিহ্নিত করার সক্ষমতা। যদি ভবিষ্যতে কোনো এআই এই পরীক্ষায় সফল হয়, তবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দর্শনের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। তখন এআই হবে মানুষের প্রকৃত সহযাত্রী, যা আমাদের এমন সব সমস্যার সমাধান দেবে যা আজ অবধি আমাদের কল্পনার বাইরে।
