বাগেরহাটে খান জাহান আলী (রহ.) মাজার সংলগ্ন ঐতিহাসিক দীঘিতে এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় সাত বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দীঘিতে থাকা কুমিরের আকস্মিক আক্রমণে শিশুটি পানিতে টেনে নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে চলা অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের পর ভোরের দিকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় গভীর শোক ও আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে মাজারসংলগ্ন দীঘির পূর্ব পাশের নারীদের ঘাটে শিশু ফাতেমা আক্তার (৭) গোসল করতে নামে। হঠাৎ করে দীঘির পানিতে থাকা একটি কুমির দ্রুত গতিতে উঠে এসে শিশুটিকে টেনে পানির গভীরে নিয়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে ঘাটে উপস্থিত লোকজন চিৎকার শুরু করলে মুহূর্তেই চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা নৌকা ও বাঁশের সাহায্যে শিশুটিকে খোঁজার চেষ্টা শুরু করেন। তবে অন্ধকার ও পানির গভীরতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার কার্যক্রম সফল হয়নি। পরে মাজার কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় বাসিন্দা, ফায়ার সার্ভিস এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে রাতভর অনুসন্ধান অভিযান চালান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার সময় সেখানে অনেক মানুষ উপস্থিত থাকলেও কুমিরের ভয়ে কেউই পানিতে নামতে সাহস পাননি। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে তল্লাশি চালানো হয়।
ভোরের দিকে দীঘির মহিলা ঘাট সংলগ্ন এলাকা থেকে শিশুটির নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের পর সেখানে উপস্থিত স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দারাও এ দৃশ্য দেখে শোকাহত হয়ে পড়েন।
স্থানীয় এক দোকানদার জানান, শিশুটিকে পানির নিচে টেনে নেওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, কুমিরের আক্রমণের পর পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলে যায় যে, উপস্থিত কেউই তাৎক্ষণিকভাবে কিছু করতে পারেননি। তিনি আরও জানান, শিশুটির শরীরে আঘাতের একাধিক চিহ্ন ছিল।
মাজারের প্রধান খাদেম জানান, মরদেহ উদ্ধার শেষে সেটি ঘাটের কাছাকাছি রাখা হয় এবং প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিশুটির পরিবার অত্যন্ত অসহায়। তার মা মানসিকভাবে অসুস্থ এবং ভবঘুরে প্রকৃতির জীবনযাপন করেন। এ কারণে শিশুটির দাফনসহ সব ধরনের ব্যয় সরকার বহন করবে।
ঘটনাটির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে দেওয়া হলো—
সারণি: ঘটনার সময়ক্রম
| সময় | ঘটনা |
|---|---|
| রাত সাড়ে আটটা | শিশু ফাতেমা ঘাটে গোসল করতে নামে |
| কিছুক্ষণ পর | কুমির শিশুটিকে পানিতে টেনে নেয় |
| রাত থেকে ভোর | স্থানীয় ও প্রশাসনের যৌথ উদ্ধার অভিযান |
| ভোর | শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয় |
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বহু বছর ধরে দীঘিতে থাকা কুমিরটি জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করে আসছিলেন। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তাদের দাবি।
এ ঘটনার পর দীঘির নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি আরও জোরালো হয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত কুমির অপসারণ এবং ঘাট এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোকবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।
