কাউয়াদীঘি হাওরে প্রান্তিক কৃষকের ভয়াবহ ফসল ক্ষতি চিত্র

মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারের পাকা ধান ব্যাপক জলাবদ্ধতার কারণে তলিয়ে গিয়ে প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষি ও জমি বন্ধক নিয়ে চাষ করা কৃষকদের জন্য চরম ক্ষতির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পানির নিচে থাকা ধান কাটার চেষ্টা করেও শ্রমিক, নৌকা ও অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেক কৃষক আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কোথাও কাটা ধান পচে যাচ্ছে, আবার কোথাও ধানের আঁটিতে অঙ্কুর বের হচ্ছে বলে জানা গেছে।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের বিরইমাবাদ এলাকায় দেখা যায়, কৃষকেরা অল্প রোদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধান রক্ষার চেষ্টা করছেন। কেউ আধপাকা ধান কেটে উঁচু স্থানে রাখছেন, কেউ নৌকায় করে ধান সরাচ্ছেন, আবার কেউ ভেজা ধান মাড়াই করছেন। অনেক জায়গায় ধানের স্তূপ পানিতে ডুবে যাচ্ছে এবং পচন ধরছে।

কৃষকদের অভিযোগ অনুযায়ী, ৪০ থেকে ৫০ আঁটি ধান পানির নিচ থেকে তুলতে নৌকা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং শ্রমিকের মজুরি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে ধান বিক্রি করে খরচ উঠছে না। ক্রেতারাও পচা বা অঙ্কুরিত ধান কিনতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন, অথবা ন্যায্যমূল্য দিচ্ছেন না।

জেলার রাজনগর উপজেলার মাথিউরা চা-বাগান এলাকায় গোপাল নুনিয়া পাঁচ কিয়ার জমি ইজারা নিয়ে চাষ করেন। তিনি জানান, পানির নিচ থেকে মাত্র চার শতক জমির ধান তুলতে পেরেছেন, যেখানে থেকে দুই থেকে তিন মণ ধান পাওয়া গেছে। ছয়জন শ্রমিক দিয়ে ধান তুলতে তাঁর প্রায় আট হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এর আগে চাষাবাদে তাঁর খরচ ছিল দশ হাজার টাকারও বেশি।

রাজনগরের জলিল মিয়া পাঁচ কিয়ার জমি বন্ধক নিয়ে চাষ করেছিলেন। তিনি বলেন, মাত্র আধা কিয়ার জমির ধান তুলতে পেরেছেন এবং নৌকার অভাবে অনেক ধান পানিতেই রয়ে গেছে।

বিরইমাবাদ গ্রামের আবদুল কাদির দশ কিয়ার জমি বর্গা চাষ করেছিলেন, যার মধ্যে ছয় কিয়ার এখন পানির নিচে। চার কিয়ার জমির ধান তুলতে তাঁর চব্বিশ হাজার টাকা খরচ হলেও বিক্রি করেছেন তেইশ হাজার টাকায়। ফলে তিনি লোকসানে পড়েছেন।

বুড়িকোনা গ্রামের আলাল মিয়া ও শফিক মিয়া জানান, অধিকাংশ জমি পানির নিচে চলে যাওয়ায় তাদের কেবল সামান্য অংশের ধান তুলতে পেরেছেন, বাকি ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কৃষক এখন নিজের খাবার ধান নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

কৃষি ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

বিষয়তথ্য
পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমি২৩৪৯ হেক্টর (জেলা পর্যায়)
গোপাল নুনিয়ার খরচপ্রায় ১৮,০০০ টাকা (চাষ + উত্তোলন)
গোপাল নুনিয়ার আয়প্রায় ২–৩ মণ ধান
আবদুল কাদিরের খরচ২৪,০০০ টাকা
আবদুল কাদিরের আয়২৩,০০০ টাকায় বিক্রি

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে দ্রুত পানি নামানো সম্ভব হচ্ছে না। সেচ কার্যক্রম চললেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে মাঠপর্যায়ের তথ্য পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, হাওর রক্ষা আন্দোলন কাউয়াদীঘি হাওরের কৃষকদের ক্ষতি নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এই স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়।

এভাবে হাওর এলাকার কৃষকেরা বর্তমানে ফসল হারানো, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে চরম আর্থিক সংকটে রয়েছেন।