তাজপুর থেকে আইপিএলে বৈভবের উত্থানের গল্প

বিহারের সমস্তিপুর জেলার তাজপুরের কিশোর বৈভব সূর্যবংশী খুব অল্প বয়সেই ভারতীয় ক্রিকেটে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে আইপিএল মেগা নিলামের প্রস্তুতির সময় রাজস্থান রয়্যালসের ক্রিকেট পরিচালক জুবিন বারুচা ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকপক্ষকে বৈভবের জন্য ১০ কোটি রুপি পর্যন্ত বাজেট সংরক্ষণের প্রস্তাব দেন। সে সময় বৈভব ছিলেন মাত্র ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর, যার নাম ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠিত পরিসরেও তখনো ব্যাপক পরিচিত হয়নি।

রাজস্থান রয়্যালসের ম্যানেজমেন্ট প্রথমে বিষয়টিকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখলেও বারুচা নিজের পর্যবেক্ষণে অনড় ছিলেন। মহারাষ্ট্রের তালেগাঁওয়ে রয়্যালস একাডেমির একটি ট্রায়ালে বৈভবের ব্যাটিং দেখে তিনি মুগ্ধ হন। একটি বাঁহাতি পেসারের দ্রুতগতির ডেলিভারিকে বৈভব এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে ছক্কায় পরিণত করেন। পরে তাকে আলাদা করে আরও পরীক্ষা করা হয়। দ্রুতগতির বল মোকাবিলার জন্য বিশেষ সাইডআর্ম বোলার এবং দীর্ঘদেহী বোলারদের বিপক্ষে নেটে ব্যাট করতে দেওয়া হলে বৈভব ১৫৭ কিলোমিটার গতির শর্ট বল সাইটস্ক্রিনের ওপর দিয়ে ছক্কা মারেন। এই পারফরম্যান্স বারুচাকে আরও নিশ্চিত করে।

বারুচা ম্যানেজমেন্টকে জানান, বৈভবের মধ্যে অসাধারণ প্রতিভা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে বড় ক্রিকেটার হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট। শেষ পর্যন্ত নিলামে রাজস্থান রয়্যালস তাকে ১.১ কোটি রুপিতে দলে নেয়, যা প্রাথমিক আলোচিত সম্ভাব্য বাজেটের তুলনায় অনেক কম।

আইপিএলে দ্রুত পরিচিতি

২০২৫ সালের আইপিএলে বৈভব নিজের প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকিয়ে নজর কাড়েন। পরে গুজরাট টাইটানসের বিপক্ষে মাত্র ১৪ বছর ৩২ দিন বয়সে সেঞ্চুরি করেন। ৩৫ বলে করা এই শতক আইপিএল ইতিহাসে ক্রিস গেইলের পর দ্বিতীয় দ্রুততম শতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিষয়তথ্য
পূর্ণ নামবৈভব সূর্যবংশী
জন্মস্থানতাজপুর, সমস্তিপুর, বিহার
আইপিএল দলরাজস্থান রয়্যালস
নিলাম মূল্য১.১ কোটি রুপি
আইপিএল সেঞ্চুরি১৪ বছর ৩২ দিন বয়সে
শতকের গতি৩৫ বলে

পরিবারের ভূমিকা ও শুরুর সংগ্রাম

বৈভবের বাবা সঞ্জীব সূর্যবংশী নিজেও ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তবে বিহারের ক্রিকেট দীর্ঘদিন বিসিসিআইয়ের পূর্ণ স্বীকৃতির বাইরে থাকায় সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। পরে জীবিকার সন্ধানে তিনি মুম্বাইয়ে গিয়ে বিভিন্ন কাজ করেন, যার মধ্যে নাইট ক্লাবে বাউন্সারের কাজ এবং শিপিং ইয়ার্ডে শ্রমিক হিসেবেও কাজ ছিল।

গ্রামে ফিরে তিনি পারিবারিক গয়নার ব্যবসায় যুক্ত হন। ছেলের মধ্যে নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ দেখেন। বৈভবের চতুর্থ জন্মদিনে তাকে একটি কাশ্মিরি উইলোর ব্যাট উপহার দেন।

২০১৮ সাল থেকে প্রতি দুই দিন পরপর নিজের পুরোনো গাড়িতে করে বৈভবকে নিয়ে পাটনার একটি ক্রিকেট একাডেমিতে যাতায়াত শুরু করেন সঞ্জীব। যাওয়া-আসায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হতো। কোচ মনীষ কুমার ওঝার মতে, বৈভব প্রতিদিন প্রায় ৬০০ বল খেলত এবং দীর্ঘ অনুশীলনেও ক্লান্তির লক্ষণ দেখা যেত না।

এর আগে সমস্তিপুরের পৌর মাঠে কোচ ব্রজেশ ঝার অধীনে তিন বছর অনুশীলন করেন বৈভব। খুব অল্প বয়সেই তার মধ্যে বয়সের তুলনায় ব্যাটিংয়ের পরিপক্বতা লক্ষ্য করা যায়। লকডাউনের সময়ও বিশেষ অনুমতি নিয়ে তার অনুশীলন চালু রাখা হয়েছিল।

ব্যাটিং ধরণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পারফরম্যান্স

বৈভবের ব্যাটিং স্টাইল নিয়ে অনেকেই ঋষভ পন্তের কথা মনে করলেও তার নিজস্ব অনুপ্রেরণা ব্রায়ান লারা। ইউটিউব দেখে লারার ব্যাটিং বিশ্লেষণ করে নিজের ব্যাকলিফট তৈরি করেছেন বলে জানা যায়।

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে বৈভব ৮০ বলে ১৭৫ রান করেন। ইনিংসটিতে ১৫টি ছক্কা ছিল। যুব ওয়ানডে ক্রিকেটে এটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড পারফরম্যান্স হিসেবে আলোচিত হয়। পুরো টুর্নামেন্টে ১৬২ স্ট্রাইক রেটে ৪৪৪ রান সংগ্রহ করেন তিনি।

মাত্র ১২ বছর ২৮৪ দিন বয়সে রঞ্জি ট্রফিতে অভিষেকের মাধ্যমে বৈভব আরও একটি রেকর্ড গড়েন। বর্তমানে তিনি বিহার দলের সহ-অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

তাজপুরে প্রভাব

বৈভবের সাফল্যের পর তাজপুর ও সমস্তিপুর অঞ্চলে ক্রিকেটে আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্থানীয় কোচদের তথ্য অনুযায়ী, এখন প্রতিদিন চার থেকে সাত বছর বয়সী ৬০ জনের বেশি শিশু নিয়মিত অনুশীলনের জন্য মাঠে আসে। বৈভবের উত্থান স্থানীয় পর্যায়ে ক্রিকেট সংস্কৃতিতেও প্রভাব ফেলেছে।

তাজপুর, যা আগে একটি সাধারণ গ্রাম হিসেবেই পরিচিত ছিল, এখন অনেকের কাছে বৈভব সূর্যবংশীর বাড়ি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। স্থানীয়ভাবে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির পেছনে তার অবদান দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।