বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬–২৭ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য কঠোর মুদ্রানীতি অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন সময়কালের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতি বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই এখনো তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। ব্যবসায়ী মহল থেকে সুদের হার কমানোর চাপ বাড়লেও নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এই মুহূর্তে শিথিলতা দেখালে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ঘোষণা অনুযায়ী, নীতিগত সুদের হার বা রেপো হার ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন যে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, তবে তা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অনেক ওপরে। ডিসেম্বর মাসে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি আট শতাংশের সামান্য বেশি ছিল, যেখানে চলতি অর্থবছরের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ছয় শতাংশ। আগের দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, মূল্যস্ফীতি সাত শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত কঠোর নীতি বজায় থাকবে। সেই শর্ত এখনো পূরণ না হওয়ায় বর্তমান অবস্থান অব্যাহত রাখা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আট শতাংশেই রাখা হয়েছে। বাস্তবে ঋণ প্রবৃদ্ধি বর্তমানে প্রায় ছয় দশমিক দুই শতাংশে সীমিত রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিনিয়োগে ধীরগতি ও চাহিদা কমে যাওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমা ১৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৯ শতাংশ করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় নির্বাহে সরকারকে কিছুটা বাড়তি সুযোগ দেবে।
গত ছয় মাসে ব্যাংকিং খাতে সুদের হারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। গড় ঋণ সুদ প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি, আর গড় আমানত সুদ ছয় শতাংশের ওপরে উঠেছে। এতে সঞ্চয়কারীরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের ব্যয় বেড়েছে, যা তাদের কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করছে।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে তিনিও সুদের হার কমাতে আগ্রহী। তবে তাঁর মতে, সময়ের আগেই নীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতি দমনে অর্জিত অগ্রগতি নষ্ট হতে পারে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় মূল্যস্ফীতি প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছিল, সেখান থেকে বর্তমানে প্রায় সাড়ে আট শতাংশে নামা একটি অগ্রগতি হলেও চূড়ান্ত সাফল্য নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য হলো আগামী দুই বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতিকে তিন থেকে চার শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা।
বৈদেশিক খাতে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। ২০২৫ সালের মে মাসে আরও নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা গ্রহণের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি বন্ধ করে বরং ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে। ফলে চলতি হিসাব প্রায় ভারসাম্যে এসেছে, আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত দেখা গেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বেড়েছে। জানুয়ারির শেষ দিকে মোট রিজার্ভ ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে এবং প্রায় এক বছর ধরে বিনিময় হার স্থিতিশীলভাবে ১২২–১২৩ টাকার মধ্যে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য জুনের মধ্যে রিজার্ভ ৩৫ থেকে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।
প্রধান মুদ্রা ও আর্থিক সূচক
| সূচক | বর্তমান অবস্থা | পূর্ববর্তী বা লক্ষ্যমাত্রা |
|---|---|---|
| নীতিগত সুদের হার | ১০ শতাংশ | অপরিবর্তিত |
| মূল্যস্ফীতি (ডিসেম্বর) | ৮ শতাংশের বেশি | লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ |
| বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি | ৬.২ শতাংশ (বাস্তব) | লক্ষ্যমাত্রা ৮ শতাংশ |
| সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির সীমা | ১৯ শতাংশ | আগে ১৮ শতাংশ |
| গড় ঋণ সুদ | প্রায় ১২ শতাংশ | গত ছয় মাস |
| গড় আমানত সুদ | ৬ শতাংশের বেশি | গত ছয় মাস |
| বিনিময় হার | ১২২–১২৩ টাকা প্রতি ডলার | প্রায় এক বছর স্থিতিশীল |
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে যে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার মাধ্যমেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক খাতের স্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
