বর্তমানে দেশজুড়ে বইছে তীব্র দাবদাহ। কক্সবাজারের প্রখর রোদ ও খরতাপ জনজীবনে অস্বস্তি আনলেও তা জেলার দুটি প্রধান শিল্প—লবণ ও শুঁটকির জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছিল। তবে লবণের উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও মাছের তীব্র সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার শুঁটকি শিল্প। পর্যাপ্ত রোদ থাকা সত্ত্বেও উপকূলে মাছের জোগান না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে ছয় শতাধিক শুঁটকিমহাল। ১৫ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ শিকারে ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
Table of Contents
মহালের বর্তমান অবস্থা ও মাছের সংকট
কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক এলাকায় দেশের বৃহত্তম শুঁটকিপল্লী অবস্থিত। এখানে প্রায় ৭০০টি মহালে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করা হয়। সাধারণত অক্টোবর থেকে মে মাস পর্যন্ত শুঁটকির ভরা মৌসুম হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু মৎস্য বিভাগের নিষেধাজ্ঞা এবং সাগরে কাঙ্ক্ষিত মাছ ধরা না পড়ায় বর্তমানে প্রায় ৬৫০টি মহাল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। মাত্র ৫০-৬০টি মহালে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত মাছ দিয়ে সীমিত পরিসরে উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞার আগে মহাল মালিকরা পর্যাপ্ত মাছ সংগ্রহ করে মজুত রাখতেন, কিন্তু এ বছর মাছের আকাল থাকায় তা সম্ভব হয়নি। ফলে অনুকূল আবহাওয়া থাকা সত্ত্বেও কাঁচামালের অভাবে রোদে শুকানোর কাজ করা যাচ্ছে না।
শ্রমিকদের কর্মহীনতা ও জীবনসংগ্রাম
শুঁটকিমহালগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন, যাদের এক-তৃতীয়াংশই নারী। নাজিরারটেকের শুঁটকিপল্লীর প্রায় ৯৫ শতাংশ শ্রমিকই ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত জলবায়ু উদ্বাস্তু। বর্তমানে কাজ না থাকায় তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
একজন নারী শ্রমিক ১২ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে দিনে মাত্র ৫০০ টাকা মজুরি পান, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে সাত সদস্যের পরিবার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারে অসুস্থ সদস্যের চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। হিমাগারে সংরক্ষিত আমদানিকৃত মাছ ফুরিয়ে গেলে অবশিষ্ট শ্রমিকদেরও বেকার হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতির পরিসংখ্যান
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিগত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে শুঁটকির গড় উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। নিচে কক্সবাজারের শুঁটকি উৎপাদন ও বর্তমান বাজারমূল্যের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
সারণি ১: শুঁটকি উৎপাদনের পরিসংখ্যান
| সময়কাল | মোট উৎপাদন (মেট্রিক টন) | মাসিক গড় উৎপাদন (মেট্রিক টন) |
| গত অর্থবছর (১২ মাস) | ৪৮,২৮৫ | ৪,০০০ |
| চলতি অর্থবছর (প্রথম ৮ মাস) | ৩১,০০০ | ৩,৮৭৫ |
সারণি ২: বাজারে শুঁটকির বর্তমান মূল্যতালিকা
| শুঁটকির ধরন | প্রতি কেজির মূল্য (টাকা) |
| ছুরি শুঁটকি | ৯০০ — ২,৫০০ |
| লইট্যা শুঁটকি | ৯০০ — ১,৯০০ |
| লাক্ষ্যা শুঁটকি | ২,০০০ — ৩,৮০০ |
| কোরাল শুঁটকি | ২,২০০ — ৩,৫০০ |
| পোপা শুঁটকি | ৫৫০ — ১,৭০০ |
| ছোট মাছের শুঁটকি | ৩৫০ — ৮০০ |
স্থানীয় বাজারের অস্থিরতা ও আমদানিকৃত শুঁটকি
নাজিরারটেক ছাড়াও মহেশখালী, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন ও কুতুবদিয়ার শুঁটকিপল্লীগুলো এখন জনশূন্য। এই সুযোগে শহরের শুঁটকি বিপণি বিতানগুলোতে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে প্রতি কেজি শুঁটকিতে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় চাহিদার বড় একটি অংশ মেটানো হচ্ছে পাকিস্তান, ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানিকৃত শুঁটকি দিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে পর্যটকদের কাছে আমদানিকৃত বা হিমাগারে সংরক্ষিত পুরোনো শুঁটকি স্থানীয় পণ্য হিসেবে চড়া দামে বিক্রি করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
মৎস্য বিভাগের পর্যবেক্ষণ
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরে মাছের বিচরণ ও প্রাপ্যতা কমেছে। কেন উৎপাদন কমছে, তা নিয়ে বর্তমানে অনুসন্ধান চলছে। ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, শুঁটকির উৎপাদন সচল রাখতে এবং শ্রমিকদের জীবিকা রক্ষায় মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। ৫৮ দিনের এই নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে জেলেরা পুনরায় সাগরে ফিরবেন এবং তখন মাছের সরবরাহ বাড়লে শুঁটকির দাম ও উৎপাদন স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।